দেশে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে মৃত্যু এক হাজার ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা পর্যন্ত নিশ্চিত ও সন্দেহজনক হাম-সম্পর্কিত মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৯ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সর্বশেষ মারা যাওয়া সাত শিশুর সবাইকে সন্দেহজনক হামজনিত মৃত্যুর তালিকায় রাখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত হামসদৃশ উপসর্গে ৯১৯ জন এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম আক্রান্ত ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
একদিনে নতুন রোগী ৮৫৫
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে ৮১৬ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার ৬৩৮।
একই সময়ে পরীক্ষায় আরও ৩৯ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। ফলে পরীক্ষায় নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার ৬ জন।
সন্দেহজনক ও নিশ্চিত রোগী মিলিয়ে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগীর সংখ্যা ৮৫৫।
হাসপাতালে ভর্তি দেড় লাখের বেশি
১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৫০ হাজার ২০২ জন। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৮৫ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সন্দেহজনক রোগী ছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ১৪৮ জন এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত রোগী ছিল ১৯ হাজার ৫২৭ জন। তখন মোট মৃত্যু ছিল ৯৮৬। অর্থাৎ ৩ থেকে ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মৃত্যু বেড়েছে আরও ৩৩ জন। একই সময়ে সন্দেহজনক রোগী বেড়েছে ৯ হাজার ৪৯০ এবং নিশ্চিত রোগী বেড়েছে ৪৭৯ জন।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে প্রাদুর্ভাব
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত এপ্রিলে বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতিকে জাতীয় পর্যায়ে ‘উচ্চ ঝুঁকির’ বলে চিহ্নিত করেছিল। তখনই দেশের আট বিভাগের ৫৮ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল।
সংস্থাটির হিসাবে, প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে আক্রান্তদের বড় অংশই ছিল শিশু। এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত সন্দেহজনক রোগীদের ৭৯ শতাংশের বয়স ছিল পাঁচ বছরের নিচে। সন্দেহজনক মৃত্যুর বড় অংশও ছিল টিকা না পাওয়া দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে রোগটি গুরুতর হতে পারে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি ও মস্তিষ্কের প্রদাহসহ বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হতে পারে।
টিকাদানে ঘাটতির পর বড় প্রাদুর্ভাব
বাংলাদেশের বর্তমান হাম প্রাদুর্ভাবের পেছনে শিশুদের টিকাদানে তৈরি হওয়া বড় ঘাটতিকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে হাম-রুবেলা টিকার দেশব্যাপী মজুত সংকট, নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিত দেশব্যাপী সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি না হওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিশু সুরক্ষার বাইরে থেকে যায়। বর্তমান প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তদের উল্লেখযোগ্য অংশ টিকা পায়নি অথবা প্রয়োজনীয় সব ডোজ পায়নি।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়া এবং টিকার ঘাটতিকে সংক্রমণ বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
জরুরি টিকাদানের পরও থামেনি মৃত্যু
প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও গ্যাভির সহায়তায় ৫ এপ্রিল উচ্চঝুঁকির ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান শুরু করে। পরে কর্মসূচি দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা হয়।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতেও বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে। মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সেখানে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়।
তবে সংক্রমণ ও মৃত্যু অব্যাহত থাকায় সরকার আবারও বড় পরিসরে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
২৫ সেপ্টেম্বর থেকে আবার দেশব্যাপী টিকাদান
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে দেশব্যাপী বিশেষ হাম টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে।
তিনি বলেন, নতুন করে হামে আক্রান্ত শিশুদের বেশির ভাগই এখনো হাম প্রতিরোধী টিকা পায়নি।
দেশে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা এমন সময়ে ১ হাজার ছাড়াল, যখন ডেঙ্গুতেও আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়ছে। ফলে একই সময়ে দুটি সংক্রামক রোগের রোগী সামলাতে হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে ঢাকার কয়েকটি হাসপাতালে শিশু রোগীর চাপ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর সংকটের কথাও উঠে এসেছে।



