HomeBlog

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রবীণ নেতা ও সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রায় ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে অনুষ্ঠিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে অনুষ্ঠিত ভোটগ্রহণ শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন ফলাফল ঘোষণা করেন। সংসদের ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে ৩৪৩ জন ভোট দেন। ছয়জন সংসদ সদস্য ভোটদানে অংশ নেননি। সব ব্যবহৃত ব্যালট বৈধ হিসেবে গণ্য হয়।

নির্বাচন কমিশন পরে গেজেট জারি করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী এ গেজেট প্রকাশ করা হয়।

২৫৫-৮৮ ভোটে জয়

বৃহস্পতিবার দুপুর ২টার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়। সংসদ সদস্যরা উন্মুক্ত ব্যালটের মাধ্যমে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেন। শুরুতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভোট দেন। এরপর ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং অন্য সংসদ সদস্যরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মির্জা ফখরুলও ভোট দেন।

বিকেল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ব্যালট গণনা শুরু হয়। গণনা শেষে মির্জা ফখরুল ২৫৫ এবং অলি আহমদ ৮৮ ভোট পান। ফল ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানান। বিরোধী দলের নেতারাও তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে ভোট

বাংলাদেশে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর। সে নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস আওয়ামী লীগ প্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরীকে পরাজিত করেছিলেন। এরপর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনগুলোতে একাধিক প্রার্থী না থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। ফলে বৃহস্পতিবারের নির্বাচন ছিল প্রায় ৩৫ বছরের মধ্যে প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।

এই নির্বাচন এমন একটি সংসদে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি এবং দলটিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া এবং স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় রাষ্ট্র পরিচালনা করা দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্বহীন রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন হিসেবে উল্লেখ করেছে।

বর্তমান সংসদে বিএনপি ও তার মিত্রদের শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলের জয় আগে থেকেই অনেকটা প্রত্যাশিত ছিল। সংসদে বিএনপির ২৪৭ জন সদস্য রয়েছেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও তার মিত্রদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সদস্যসংখ্যা ৯০।

শুক্রবার শপথ

নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। শপথের মধ্য দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। বঙ্গভবনে ইতোমধ্যে শপথ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির পদ বাংলাদেশের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় প্রধানত সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক হলেও রাষ্ট্রপতি একই সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রধান এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক সংকটের সময় এই পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শিক্ষকতা থেকে বঙ্গভবনের পথে

৭৮ বছর বয়সী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে তিনি শিক্ষকতা করেছেন। পরে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন সময়ে সংসদ সদস্য ও সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ সময় দলের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি বিএনপির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক মুখ হয়ে ওঠেন।

বিএনপি দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থাকার সময় মির্জা ফখরুল দলটির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্যতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তি ছিলেন। বিভিন্ন আন্দোলন, নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংকটের সময় দলের অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় পরিবর্তন আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল শেষে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ও তার মিত্ররা দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে ক্ষমতায় ফেরে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হন। সেই পরিবর্তিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেই এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন বিএনপির দীর্ঘদিনের নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

এর আগে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয় এবং সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেই প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ হিসেবে বৃহস্পতিবার সংসদ সদস্যদের ভোটে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন।

সাংবাদিক দেবাশীষসহ চার স্বজনের মরদেহ শনিবার দেশে আসতে পারে

সাংবাদিক দেবাশীষসহ চার স্বজনের মরদেহ শনিবার দেশে আসতে পারে

কলকাতার একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ তার পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ শনিবার দেশে আনা হতে পারে। বৃহস্পতিবার তাদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মরদেহ হস্তান্তরের পর বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে সেগুলো দেশে এনে স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

কলকাতাস্থ বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের কর্মকর্তা আব্দুস সামাদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে মরদেহ হস্তান্তরের পর সেগুলো স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। মরদেহ দেশে আনার যাবতীয় খরচ বাংলাদেশ সরকার বহন করছে।

নিহতদের পারিবারিক সূত্র জানায়, দেবাশীষ দত্তের মরদেহ গ্রহণের জন্য তার ভায়রা ফিরোজ হাসান বুধবার সন্ধ্যায় কুষ্টিয়া থেকে কলকাতায় পৌঁছেছেন। এছাড়া কলকাতায় অবস্থানরত দেবাশীষের আত্মীয় সঞ্চয় ঘোষ ও তার ভগ্নিপতির ভাই কাঞ্চন নন্দীও মরদেহ গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেবাশীষ দত্তসহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত নয়জনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।

কলকাতাস্থ বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব (রাজনৈতিক) মো. ওমর ফারুক আকন্দ এবং কর্মকর্তা আব্দুস সামাদ মরদেহগুলো বাংলাদেশে পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করছেন।

কলকাতায় অবস্থানরত নিহতদের স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, চারটি মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় আড়াই লাখ রুপি খরচ হতে পারে। পরিবারের পক্ষে এই বিপুল ব্যয় বহন করা কঠিন হওয়ায় বাংলাদেশ সরকার সরকারি ব্যবস্থাপনায় মরদেহ দেশে আনার উদ্যোগ নিয়েছে।

এদিকে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন নিহত চারজনের সৎকার ও দাফনের জন্য প্রত্যেক পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাকির হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের মরদেহ বিনামূল্যে সৎকারেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কুষ্টিয়া প্রেস ক্লাবের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

একই সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডে মা-বাবাকে হারানো দেবাশীষ দত্ত ও আফসানা শারমীন দম্পতির জীবিত একমাত্র সন্তান মহিমা দত্তের এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দেবাশীষ দত্ত ও তার তিন বছর বয়সী ছেলে স্বর্ণশীষ দত্তের মরদেহ হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সৎকার করা হবে। দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শারমীন এবং শ্বশুর আকরাম হোসেনের মরদেহ ইসলামী রীতি অনুযায়ী জানাজা শেষে দাফন করা হবে।

মঙ্গলবার গভীর রাতে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার ১৫ জি মির্জা গালিব স্ট্রিটে অবস্থিত শিখা-ইন আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে নয়জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি এবং দুজন ভারতীয় নাগরিক।

অগ্নিকাণ্ডে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রাণ হারানো দেবাশীষ দত্ত সাংবাদিকতা পেশায় দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। তিনি চ্যানেল নাইন ও আজকের পত্রিকার কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি এবং কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি কুষ্টিয়া প্রেস ক্লাবের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন।

একুশের চেতনায় দুর্নীতি ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আহ্বান টিআইবির

অমর একুশের চেতনা প্রতিষ্ঠা ছাড়া “নতুন বাংলাদেশ” গড়া সম্ভব নয়—এমন মন্তব্য করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, দুর্নীতি ও ধর্মান্ধতাকে প্রতিহত করাই একুশের মূল শিক্ষা। তার মতে, ভাষা আন্দোলনের চেতনা ছিল বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই, যেখানে সব মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করাই ছিল মূল লক্ষ্য।

শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকালে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “দুর্নীতি একুশের চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। একুশ আমাদের শিখিয়েছে—বাংলাদেশের সব মানুষের সমান অধিকার থাকতে হবে। বিশেষ করে নারী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, আদিবাসী, প্রতিবন্ধীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করাই একুশের চেতনার মূল বিষয়।”

তিনি আরও বলেন, সমাজে যেসব শক্তি মানুষের সমান অধিকারকে অস্বীকার করে বা খর্ব করে, তাদের বিরুদ্ধেই একুশের চেতনার অবস্থান। “যে শক্তি মানুষের মৌলিক অধিকার—সমান মর্যাদা ও নিরাপদ জীবনযাপনের পথে বাধা সৃষ্টি করে, তাকে প্রতিহত করতেই হবে,” বলেন তিনি।

টিআইবির নাম বাংলায় না রাখার বিষয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, টিআইবি একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং এই নামেই এটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তবে ভাষা আন্দোলনের চেতনার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “ভাষা আন্দোলন মানে শুধু বাংলা ভাষার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নয়। এর অর্থ কখনোই অন্য ভাষাকে বর্জন করা বা অবমূল্যায়ন করা ছিল না। আমাদের শহীদদের চেতনায় অন্য ভাষার প্রতি অসম্মান ছিল না।”

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বাংলাদেশে বাংলার পাশাপাশি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা রয়েছে, যেগুলোর চর্চা ও সংরক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। “আমাদের দেশ বহুভাষিক বাস্তবতার মধ্যেই গড়ে উঠেছে,” বলেন তিনি।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, “আজ আমরা যখন ভাষার অধিকারের কথা বলি, তখন প্রশ্ন আসে—কেন তা শুধু বাংলা ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ শব্দবন্ধটির অর্থই হলো, প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব মাতৃভাষা চর্চার সমান অধিকার নিশ্চিত করা।”

তিনি বলেন, একুশের চেতনা আসলে বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের আহ্বান। “সব মানুষের সমান অধিকার এবং নির্বিঘ্নে ভাষা চর্চার পথে যেসব অন্তরায় রয়েছে, সেগুলো আমাদের স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে,” বলেন তিনি।

ড. ইফতেখারুজ্জামান যোগ করেন, “এই অন্তরায়গুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো দুর্নীতি ও ধর্মান্ধতা। এই দুই শক্তি সমাজে বৈষম্য তৈরি করে, মানুষে মানুষে বিভাজন সৃষ্টি করে এবং ভাষা আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।”

তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে—একুশের চেতনা শুধু অতীত স্মরণের বিষয় নয়, বরং বর্তমান রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার নৈতিক দিকনির্দেশনা। দুর্নীতি ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে লড়াই এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার মধ্য দিয়েই সেই চেতনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

ভাষা শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামানের এই বক্তব্য সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং সুশাসনের প্রশ্নে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

দেশে দেশে ভাষা আন্দোলন

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল কেবল একটি দিনের ঘটনা নয়, ছিল রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরস্ত্র শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বীকৃতির দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন। পুলিশের গুলিতে আবুল বরকত, আব্দুস সালাম, রফিক, শফিক ও আব্দুল জব্বারসহ অনেকেই শহীদ হন। সেই রক্তাক্ত দিনের মধ্য দিয়েই ভাষা একটি সাংবিধানিক দাবির গণ্ডি ছাড়িয়ে আত্মপরিচয়, মর্যাদা ও অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়।

বায়ান্নর এই অভিজ্ঞতা শুধু বাংলাদেশের নয়। পরবর্তী দশকগুলোতে বিশ্বের নানা দেশে ভাষার প্রশ্ন রাষ্ট্রীয় সংকট, সংঘাত এমনকি রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের কারণ হয়ে উঠেছে। ভাষা কোথাও জাতিগত বিভাজনের কেন্দ্র, কোথাও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্ন, আবার কোথাও স্বাধীনতার আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছে।

শ্রীলংকা: রাষ্ট্রভাষা নীতি থেকে গৃহযুদ্ধের পথে

১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর শ্রীলংকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সিনহালা জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসে। ১৯৫৬ সালে এস ডব্লিউ আর ডি বান্দারানায়েকের সরকার ‘সিনহালা অনলি অ্যাক্ট’ পাস করে সিনহালাকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করে। এতে প্রায় ২০ শতাংশ তামিল জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, শিক্ষা ও চাকরি থেকে কার্যত বাদ পড়ে।

তামিলদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের জবাবে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৫৮ সালের দাঙ্গায় শত শত মানুষ নিহত হন। ভাষা প্রশ্নই ধীরে ধীরে শ্রীলংকাকে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। অবশেষে ১৯৮৭ সালের ইন্দো–লংকা চুক্তির মাধ্যমে তামিল ভাষা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়, তবে তত দিনে দেশটি গভীর ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছিল।

ভারত: হিন্দি আধিপত্যের বিরুদ্ধে তামিল প্রতিরোধ

ভারতের সংবিধান ১৯৫০ সালে হিন্দিকে কেন্দ্রীয় সরকারি ভাষা হিসেবে নির্ধারণ করে এবং ১৯৬৫ সালের মধ্যে ইংরেজির ব্যবহার বন্ধ করার পরিকল্পনা নেয়। এই সিদ্ধান্ত দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

১৯৬৫ সালে তামিলনাড়ু জুড়ে সহিংস আন্দোলন শুরু হয়। আত্মদাহ, পুলিশি সংঘর্ষ ও দাঙ্গায় অন্তত ৬০–৭০ জন নিহত হন। ভাষার প্রশ্ন সেখানে রাজনৈতিক বিপ্লবে রূপ নেয়। ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের পতন ঘটে এবং দ্রাবিড় রাজনীতি শক্তিশালী হয়। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্র সরকার বাধ্য হয়ে হিন্দির পাশাপাশি ইংরেজির অনির্দিষ্টকালীন ব্যবহার নিশ্চিত করে।

বেলজিয়াম: ভাষা বিভাজন থেকে ফেডারেল রাষ্ট্র

বেলজিয়ামে দীর্ঘদিন ফরাসি ভাষা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতীক ছিল, যদিও দেশের বড় অংশ ফ্লেমিশ (ডাচ) ভাষাভাষী। ১৯৬০-এর দশকে ভাষা সংকট চরমে পৌঁছায়।

১৯৬২–৬৩ সালে ভাষাভিত্তিক আইন প্রণয়ন করে দেশকে চারটি ভাষা অঞ্চলে ভাগ করা হয়। ১৯৬৮ সালে লুভেন বিশ্ববিদ্যালয় সংকট দেশকে নাড়িয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৭০ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিক সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে বেলজিয়াম একক রাষ্ট্র থেকে ভাষাভিত্তিক ফেডারেল রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়।

স্পেন: দমন থেকে স্বায়ত্তশাসনের পথে কাতালান ভাষা

ফ্রাঙ্কো শাসনামলে (১৯৩৯–১৯৭৫) স্পেনে কাতালান, বাস্ক ও গ্যালিসিয়ান ভাষা কঠোরভাবে দমন করা হয়। গণতন্ত্রে উত্তরণের পর ১৯৭৮ সালের সংবিধান আঞ্চলিক ভাষাকে স্বীকৃতি দেয়।

কাতালান ভাষা শিক্ষা, প্রশাসন ও সংস্কৃতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ২০১০ সালের পর কাতালান স্বায়ত্তশাসন সীমিত করার উদ্যোগ ভাষাকে আবার রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। কাতালান স্বাধীনতা আন্দোলনে ভাষা হয়ে ওঠে পরিচয় ও রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতীক।

পাকিস্তান: বাংলাদেশ স্বাধীনতার পরও ভাষা সংকট

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তান ভাষা প্রশ্নে আত্মসমীক্ষার মুখোমুখি হয়। ১৯৭২ সালে সিন্ধ প্রদেশে সিন্ধি ভাষাকে প্রাদেশিক ভাষা করার সিদ্ধান্তের পর করাচি ও হায়দ্রাবাদে ভয়াবহ দাঙ্গা শুরু হয়।

উর্দুভাষী ও সিন্ধিভাষীদের সংঘর্ষে অন্তত ১৯ জন নিহত হন। শেষ পর্যন্ত দ্বিভাষিক ব্যবস্থার মাধ্যমে আপস করা হয়। ভাষা সেখানে জাতিগত রাজনীতির অংশে পরিণত হয়।

তুরস্ক: কুর্দি ভাষা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিতর্ক

তুরস্কে দীর্ঘদিন কুর্দি ভাষার ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল। বিশেষ করে ১৯৮০ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর কুর্দি ভাষায় প্রকাশনা ও শিক্ষা কার্যত অপরাধে পরিণত হয়।

১৯৯১ সালে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলেও কুর্দি ভাষা আজও পূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি। ভাষা আন্দোলন সেখানে সংখ্যালঘু অধিকার, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত।

ইউক্রেন: ভাষা, সার্বভৌমত্ব ও ভূরাজনীতি

সোভিয়েত আমলে রুশ ভাষা প্রাধান্য পেলেও ইউক্রেনীয় ভাষা ছিল জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক। স্বাধীনতার পর ভাষা নীতি রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়।

২০১৯ সালের রাষ্ট্রভাষা আইন ইউক্রেনীয় ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে। ভাষা সেখানে শুধু সাংস্কৃতিক নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের অংশ হয়ে ওঠে।

 

আজিমপুরে ভাষা শহীদদের কবর জিয়ারত করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষা শহীদদের কবর জিয়ারত করেছেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতারা।

শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে সংগঠনটির সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম মোনাজাত করেন। এ সময় ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি ও ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন শাখার দায়িত্বশীলরা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে,শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) দিনগত রাত ১২টা ২৪ মিনিটে প্রথমবারের মতো ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানান জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।

এ সময় জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম, এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। আজ দলটির আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার ভার্চুয়াল বৈঠকে নতুন এই নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়।

আজ শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) দলটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।

সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এই বৈঠকে নায়েবে আমির, সেক্রেটারি জেনারেল ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলগণ সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার (পুরুষ ও মহিলা) সদস্যবৃন্দ ভার্চুয়ালি এই বৈঠকে যুক্ত ছিলেন। জামায়াত আমির মজলিসে শূরার সঙ্গে পরামর্শ করে ২০২৬-২০২৮ কার্যকালের জন্য নির্বাচিত কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলদের নাম ঘোষণা করেন এবং তাদের শপথ পরিচালনা করেন।

ঘোষিত কমিটি অনুযায়ী নায়েবে আমির হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন- এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপি, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের এমপি এবং মাওলানা আনম শামসুল ইসলাম (সাবেক এমপি)। দলের সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার।

সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন- মাওলানা এটিএম মাছুম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, ড. হামিদুর রহমান আযাদ (সাবেক এমপি), মাওলানা আবদুল হালিম, অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, মাওলানা মুহাম্মাদ শাহজাহান এবং অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।

আগামী দুই বছরের জন্য ২১ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ গঠন করা হয়েছে। পরিষদের সদস্যরা হলেন- এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপি, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের এমপি, মিয়া গোলাম পরওয়ার (সাবেক এমপি), মাওলানা এ. টি.এম. মাছুম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, ড. হামিদুর রহমান আযাদ (সাবেক এমপি), মাওলানা আবদুল হালিম, অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, মাওলানা মোহাম্মদ শাহজাহান, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, আবদুর রব, সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, অধ্যক্ষ মো. শাহাবুদ্দীন, অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহ এমপি, অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, মো. মোবারক হোসাইন, মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, মোহাম্মদ সেলিম উদ্দীন, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি এবং ড. মোহাম্মাদ রেজাউল করিম।

এছাড়া, বৈঠকে আগামী দুই বছরের জন্য ৮৮ সদস্যের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ গঠন করা হয়েছে, যার মধ্যে ২১ জন নারী সদস্য রয়েছেন।

কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরায় জাতীয় পর্যায়ে ৫৯ জন সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন (১৭ জন নারী)। বৈঠকে ৫ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন গঠন এবং সারাদেশে ১৪টি অঞ্চলের জন্য দায়িত্বশীলগণকে অঞ্চল পরিচালক মনোনীত করা হয়।

পুরোনো কর্মচারীদের নাম ধরে ডেকে কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

মা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রিত্বকালীন সময়ের পুরোনো কর্মচারীদের দেখে কাছে ডেকে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুধু সৌজন্য বিনিময়ই নয়, তাদের পরিবারের খোঁজখবরও নেন তিনি। দীর্ঘ সময় পর পুরোনো কর্মচারীদের চিনে নাম ধরে ডেকে নেওয়ার এই ঘটনাকে স্মরণীয় ও আবেগঘন বলে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকালে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছানোর পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলার সময় এই ঘটনা ঘটে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।

তিনি বলেন, “১৯ বছর আগে যখন ম্যাডাম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সেই সময়কার কয়েকজন কর্মচারীকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চিনে ফেলেন। তিনি নাম ধরে ডেকে কথা বলেন এবং তাদের পরিবারের খোঁজখবর নেন। এটি কার্যালয়ের জন্য একটি স্মরণীয় মুহূর্ত।”

অতিরিক্ত প্রেস সচিব জানান, শনিবার সকাল ১০টা ১০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে পৌঁছান। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন তাকে স্বাগত জানান। কার্যালয়ে প্রবেশের আগে প্রধানমন্ত্রী বাগানে একটি গাছ রোপণ করেন।

এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রবেশের সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তাকে সালাম ও শুভেচ্ছা জানান। এ সময় দূর থেকে কর্মচারীদের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে দেখে প্রধানমন্ত্রী নাম ধরে ডাকেন। নিরাপত্তা বেষ্টনী অতিক্রম করে ওই কর্মচারী দ্রুত এগিয়ে এলে প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে করমর্দন করেন এবং ব্যক্তিগতভাবে তার পরিবারের খোঁজখবর নেন।

অতিরিক্ত প্রেস সচিব বলেন, “এ সময় প্রধানমন্ত্রী আরও কয়েকজন পুরোনো কর্মচারীকে নাম ধরে ডেকে কথা বলেন। যারা ১৯ বছর আগে নবীন ছিলেন, তাদের অনেকের চুল এখন পাক ধরেছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তাদের চিনতে ভুল করেননি।”

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এই তেজগাঁও কার্যালয় থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় যারা এখানে কর্মরত ছিলেন, তাদের অনেকেই এখনও চাকরিতে রয়েছেন।

আতিকুর রহমান রুমন জানান, প্রধানমন্ত্রীর এই আচরণে পুরোনো কর্মচারীরা যেমন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন, তেমনি অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও বিস্মিত হন তারেক রহমানের আন্তরিকতা ও ব্যবহারে। তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর মহানুভবতা এবং মানুষের সঙ্গে কথা বলার ভঙ্গি সবার নজর কেড়েছে।”

এরপর প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের রেড ব্লকে প্রবেশ করেন, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর চেম্বার অবস্থিত। সেখানে নিজের চেয়ারে বসে তিনি দিনের নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে স্মারক ডাক টিকিট উন্মোচন করেন।

স্মারক ডাক টিকিট উন্মোচনের পর প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার বৈঠকে অংশ নেন বলে জানান অতিরিক্ত প্রেস সচিব।

উল্লেখ্য, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর গত দুই দিন তারেক রহমান সচিবালয়ে নিজের দপ্তরে অফিস করেন। শনিবারই প্রথমবারের মতো তিনি তেজগাঁওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অফিস করলেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ও আচরণ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা চলছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনের সঙ্গে মানবিক যোগাযোগ ও স্মৃতিচারণমূলক এই উদ্যোগ কর্মক্ষেত্রে নতুন করে আস্থা ও অনুপ্রেরণা জোগাবে।

একুশের প্রথম প্রহরে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা

অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে শ্রদ্ধা আর নীরব আবেগে। শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে পুলিশের একটি চৌকস দলের গার্ড অব অনার প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি। এরপর একে একে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান নগর ও বিভাগের শীর্ষ প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও পেশাজীবী নেতারা।

প্রথম পর্যায়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান ও মো. এরশাদ উল্লাহ, বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন এবং জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তাঁদের পর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ ও পুলিশ সুপার নাজির আহমেদ খান ফুল দেন। বীর মুক্তিযোদ্ধারাও পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণ করেন।

মধ্যরাতের কর্মসূচির পর শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও পেশাজীবী সংগঠন পর্যায়ক্রমে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি, আনসার ও ভিডিপি, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, ট্যুরিস্ট পুলিশ, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন, বিভাগীয় সমাজসেবা অধিদপ্তর, যুবদল, ছাত্রদল, শ্রমিক দল, নৌ পুলিশ ও পিবিআইসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

Image

শহীদ মিনারের দিকে দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা যায়। অনেকেই খালি পায়ে প্রভাতফেরিতে অংশ নেন। কারও হাতে জাতীয় পতাকা, কারও হাতে ব্যানার-ফেস্টুন। মাইকে ভেসে আসে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গান। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে অনেক অভিভাবককে শিশুদের সঙ্গে নিয়ে আসতে দেখা গেছে।

চট্টগ্রাম ছাড়াও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় একইভাবে রাতের প্রথম প্রহর থেকে শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, খুলনা মহানগরীর শহীদ হাদিস পার্ক, রাজশাহীর সাহেববাজার শহীদ মিনার, বরিশাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এবং রংপুর নগরীর শহীদ আবু সাঈদ চত্বরেও প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী ও কক্সবাজারসহ চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলোতেও প্রভাতফেরি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নগরজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল এবং শহীদ মিনার এলাকায় প্রবেশে ধাপে ধাপে নিরাপত্তা তল্লাশি চালানো হয়।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের স্মরণে ২১ ফেব্রুয়ারি এখন কেবল বাংলাদেশের জাতীয় শোক ও গৌরবের দিনই নয়, বরং ইউনেসকো স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবেও বিশ্বজুড়ে পালিত হয়। ভাষার মর্যাদা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার বার্তা ছড়িয়ে দিতে এ দিনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নীরব প্রহরে যখন একের পর এক পুষ্পস্তবক জমা হচ্ছিল, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ভাষা আন্দোলনের চেতনা এখনও জীবন্ত। শহীদদের রক্তে অর্জিত ভাষার মর্যাদা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রত্যয়েই শেষ হয় প্রথম প্রহরের কর্মসূচি।

বকশীগঞ্জে জয় বাংলা স্লোগানে নিষিদ্ধ আ.লীগ কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন

জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের একটি ইউনিয়ন কার্যালয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ঘটনা ঘটেছে। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) ভোরে এই কর্মসূচি পালন করা হয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সকাল আনুমানিক ৭টার দিকে বকশীগঞ্জ উপজেলার বগারচর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের পরিত্যক্ত কার্যালয়ে কয়েকজন নেতা-কর্মী উপস্থিত হয়ে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে মোনাজাত করেন। এ সময় তারা দলীয় পতাকার পাশাপাশি জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন।

পতাকা উত্তোলন ও মোনাজাত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত বগারচর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সাজ্জাদ কাদির সাজু, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য রেজাউল করিম, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আইয়ুব আলী, তাঁতী লীগের যুগ্ম সম্পাদক রেজাউল এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি নিয়ামত উল্লাহসহ আরও কয়েকজন নেতা-কর্মী।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দীর্ঘ সময় কোনো কর্মসূচি না থাকায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয়টি প্রায় দেড় বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। শনিবারের এই কর্মসূচির মাধ্যমে দীর্ঘদিন পর সেখানে দলীয় নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তবে পতাকা উত্তোলন ও মোনাজাত শেষে তারা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

ঘটনার পর বগারচর ইউনিয়নজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ একে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হিসেবে দেখলেও, আবার কেউ কেউ নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের কার্যালয়ে প্রকাশ্যে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিএনপি বা জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, বিষয়টি তারা অবগত হয়েছেন এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে তারা দাবি করেন।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-এর সরকারের পতনের পর বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা বগারচর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করে। ওই ঘটনার পর থেকেই কার্যালয়টি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে এবং সেখানে আওয়ামী লীগের কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম দেখা যায়নি।

রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এই ঘটনার মাধ্যমে এলাকায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে প্রকাশ্যে পতাকা উত্তোলন ভবিষ্যতে স্থানীয় রাজনৈতিক উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে। এ বিষয়ে প্রশাসনের অবস্থান ও পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

টি–২০ বিশ্বকাপ না খেলা ক্রিকেটারদের ওপর মানসিক নির্যাতন: সালাউদ্দিন

টি–২০ বিশ্বকাপ ২০২৬ না খেলার সিদ্ধান্তকে ক্রিকেটারদের ওপর “মানসিক নির্যাতনের শামিল” বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মহম্মদ সালাউদ্দিন। এই সিদ্ধান্তের জেরে অন্তত দু’জন জাতীয় দলের ক্রিকেটার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন এবং কয়েক দিন কার্যত মানসিক কোমার মতো অবস্থায় ছিলেন বলেও বিস্ফোরক দাবি করেছেন তিনি।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল-কে সরাসরি দায়ী করে সালাউদ্দিন অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কিংবা ক্রিকেটারদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনায় না গিয়েই বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার ভাষায়, এই সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ একতরফা এবং খেলোয়াড়দের স্বপ্নকে নির্মমভাবে ধ্বংস করার নামান্তর।

সালাউদ্দিন বলেন, “একটা ছেলে হয়তো ২৫–২৭ বছর ধরে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য দিনের পর দিন কষ্ট করে। আর একজন মানুষ এক সেকেন্ডে এসে তার সেই স্বপ্ন ভেঙে দিল। এটা মানসিক নির্যাতন ছাড়া আর কী?”

তিনি জানান, এই সিদ্ধান্তে ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত ও মানসিক ক্ষতি হয়েছে। যদি রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো, তাহলে হয়তো সেই ত্যাগ মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু তার দাবি, এটি ছিল একটি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যার বোঝা বইতে হয়েছে খেলোয়াড়দের।

সালাউদ্দিন বলেন, “দলের অন্তত দু’জন ক্রিকেটার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। কোচ হিসেবে আমি জানি, প্রায় পাঁচ দিন তারা মানসিক কোমার মধ্যে ছিল। নিজেরা নিজেদের সামলাতে পারছিল না।”

প্রাক্তন ক্রীড়া উপদেষ্টার বক্তব্যের ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জাতীয় দলের এই কোচ। তার অভিযোগ, আসিফ নজরুল বিশ্বকাপ বয়কটের বিষয়ে প্রকাশ্যে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। শুরুতে তিনি সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন, বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত সরকারের। কিন্তু পরে তিনি দাবি করেন, ক্রিকেট বোর্ড ও ক্রিকেটারদের সঙ্গে আলোচনা করেই সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সালাউদ্দিন বলেন, “আমি জানি না, একজন শিক্ষক কীভাবে প্রকাশ্যে এত ডাহা মিথ্যে কথা বলতে পারেন। উনি একসময় এক কথা বলেছেন, পরে সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলেছেন। এই মিথ্যাচার আমার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।”

সালাউদ্দিনের দাবি অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত যে বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে, তা বোর্ড কর্তারা ভালোভাবেই জানতেন। জাতীয় দলের সিনিয়র ক্রিকেটার লিটন দাস, নাজমুল হোসেন শান্তদের সঙ্গে যে বড় অন্যায় হচ্ছে, সেটাও অজানা ছিল না। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে—এটা বিসিবির শীর্ষ কর্মকর্তারাও বুঝতেন। কিন্তু সরকারের চাপের কাছে তারা অসহায় ছিলেন।”

তার মতে, বিশ্বকাপ বর্জনের ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে না খেললে অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি—সবকিছুতেই ঘাটতি তৈরি হয়।

সালাউদ্দিনের এই প্রকাশ্য ক্ষোভ বাংলাদেশ ক্রিকেটে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে। সাবেক ক্রিকেটার, বিশ্লেষক এবং সমর্থকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, জাতীয় দলের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ক্রিকেটের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপ বয়কটের সিদ্ধান্ত শুধু একটি টুর্নামেন্টে না যাওয়ার বিষয় ছিল না; এটি ছিল হাজারো ক্রিকেটারের স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। সালাউদ্দিনের বক্তব্য সেই ক্ষোভ ও হতাশাকেই প্রকাশ্যে সামনে এনে দিয়েছে।

এই বিতর্কের মধ্য দিয়ে আবারও উঠে এসেছে—জাতীয় স্বার্থের নামে ক্রীড়াঙ্গনে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসংগত, এবং সেই সিদ্ধান্তের দায় শেষ পর্যন্ত কারা বহন করবে।