প্রশাসন ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে ‘ফ্যাসিবাদের দোসররা’ এখনো ঘাপটি মেরে বসে আছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। তিনি অভিযোগ করেছেন, নব্বইয়ের পরাজিত স্বৈরাচারী শক্তি এবং চব্বিশের পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তি একই সূত্রে গাঁথা। এসব শক্তি দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট, অর্থ পাচার এবং গুম-খুনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল।
শনিবার (১০ অক্টোবর) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে শহীদ জেহাদ স্মৃতি পরিষদ আয়োজিত এক স্মরণসভায় তিনি এসব কথা বলেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নিহত নাজির উদ্দিন জেহাদের ৩৬তম শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
রিজভী বলেন, ‘নব্বইয়ের পরাজিত স্বৈরাচারী শক্তি আর চব্বিশের পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তি একই সূত্রে গাঁথা।’ তাঁর অভিযোগ, এসব শক্তি গত ১৭ বছর ধরে দেশকে লুটপাট করেছে, ব্যাংক খালি করে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে এবং গুম-খুনের রাজনীতি চালিয়েছে।
‘দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে শিথিলতা দেখানো যাবে না’
প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে লুকিয়ে থাকা দুর্নীতিবাজ ও ফ্যাসিবাদের সহযোগীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান বিএনপির এই নেতা।
তিনি বলেন, যারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, জনগণের অর্থ আত্মসাৎ করেছে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো উচিত নয়।
রিজভীর মতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিলে সাধারণ মানুষ সরকারের পাশে থাকবে।
তিনি বলেন, প্রশাসন ও সমাজের ভেতরে অবস্থান করা এসব শক্তির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। অতীতের অন্যায় ও অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
দুর্গাপূজার মণ্ডপ পাহারার আহ্বান
আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং ধর্মীয় উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন রুহুল কবির রিজভী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এ দেশের মানুষ যুগে যুগে একে অপরের ধর্মীয় উৎসবে অংশ নিয়েছে।
তবে পরাজিত অপশক্তি দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ষড়যন্ত্র করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
রিজভী বলেন, ‘এই চক্রান্ত রুখে দিতে বিএনপির প্রতিটি নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণকে দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলো পাহারা দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছি, যাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভাই-বোনদের এই উৎসব নির্বিঘ্ন ও শান্তিময় হয়।’
তিনি ধর্মীয় উৎসব ঘিরে যেকোনো ধরনের উসকানি ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি প্রতিরোধে দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
‘জেহাদের আত্মত্যাগ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল’
স্মরণসভায় সভাপতির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমান উল্লাহ আমান বলেন, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদ জেহাদের আত্মত্যাগ ছাত্রসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
তিনি বলেন, জেহাদের মৃত্যুর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে ওঠে। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন আরও জোরদার হয়।
আমান উল্লাহ আমানের মতে, ছাত্রসমাজের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এবং খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্ব তৎকালীন স্বৈরশাসনের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক (জিএস) খায়রুল কবির খোকন ও সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) নাজিম উদ্দিন আলমের যৌথ সঞ্চালনায় স্মরণসভায় আরও বক্তব্য দেন নব্বইয়ের ছাত্রনেতা মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, হাবিবুর রহমান হাবিব, শিরিন সুলতানা, মীর সরাফত আলী সপু এবং ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল।
রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিয়ে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
একই দিন গাজীপুরের টঙ্গীতে বাংলাদেশ ব্লেড ফ্যাক্টরি লিমিটেডের আধুনিকায়ন শেষে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও বক্তব্য দেন রুহুল কবির রিজভী।
টঙ্গীর হোন্ডা রোডে অবস্থিত বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) অধীন প্রতিষ্ঠানটির অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন তিনি।
সেখানে রিজভী অভিযোগ করেন, একটি মহল চায় না রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফা অর্জন করুক কিংবা টিকে থাকুক।
তিনি বলেন, ষড়যন্ত্রকারীদের কর্মকাণ্ডের কারণে কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান যেন স্থবির বা দুর্বল হয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
রিজভী জানান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্লেড ফ্যাক্টরি লিমিটেডের কার্যক্রম শুরু করেছিলেন।
দীর্ঘদিন পর আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি নতুন উদ্যমে উৎপাদন শুরু করায় সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খানের পক্ষে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত সচিব রাশিদুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন বিএসইসির চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক।
বস্ত্র খাতের সংকট কাটাতে ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনের তাগিদ
শনিবার রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে আয়োজিত আরেকটি অনুষ্ঠানেও বক্তব্য দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব।
অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (অ্যাব) আয়োজিত ‘বস্ত্র খাতে বিদ্যমান সমস্যা নিরসনে করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভা এবং আইটিইটির নবনির্বাচিত কমিটির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তিনি।
রিজভী বলেন, দেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাত বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। এ খাতের বিদ্যমান সংকট কাটাতে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত পুনর্গঠন জরুরি।
তাঁর অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে দেশের ব্যাংকিং খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাব শিল্প খাতের অর্থায়নের ওপরও পড়েছে।
তিনি বলেন, সীমিত সম্পদের মধ্যেই ব্যাংক ও আর্থিক খাত পুনর্গঠন করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের সমস্যাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন রিজভী।



