দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানির ঘাটতি ও বকেয়া বিল পরিশোধে জটিলতাসহ বিভিন্ন কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম ব্যবহার করা হচ্ছে। জাতীয় সংসদের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি, জ্বালানি সরবরাহ, বাজেট বরাদ্দ এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়।
বৈঠকে জানানো হয়, দেশে গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ হাজার ৩৫৮ মেগাওয়াট। অথচ এসব কেন্দ্র থেকে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১১ হাজার ৫০০ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
অর্থাৎ উল্লিখিত তিন ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট সক্ষমতার প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে। উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রকৃত উৎপাদনের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকায় বিদ্যুৎ খাতের জ্বালানি সরবরাহ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয় বৈঠকে।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন সবচেয়ে বেশি ব্যাহত
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ২২ মেগাওয়াট। কিন্তু এসব কেন্দ্র থেকে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট।
সে হিসাবে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতার প্রায় ৩৩ থেকে ৪২ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে। সক্ষমতার তুলনায় উৎপাদনের এই ব্যবধান বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহের সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনেছে।
অন্যদিকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৬ হাজার ৯২৭ মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্র থেকে বর্তমানে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। অর্থাৎ কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার প্রায় ৭২ থেকে ৮৭ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে।
তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ৬ হাজার ৪০৯ মেগাওয়াট হলেও প্রকৃত উৎপাদন আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে রয়েছে। এসব কেন্দ্রের সক্ষমতার প্রায় ৩৯ থেকে ৪৭ শতাংশ ব্যবহার করা হচ্ছে।
বৈঠকে জানানো হয়, পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও জ্বালানির সংকট ও বকেয়া বিল পরিশোধ না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
বিদ্যুৎ খাতে ৪১ উন্নয়ন প্রকল্প
বৈঠকে বিদ্যুৎ বিভাগের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর আর্থিক বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন পরিস্থিতিও পর্যালোচনা করা হয়।
সংসদীয় কমিটিকে জানানো হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বিদ্যুৎ বিভাগের আওতায় ৪১টি উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে।
এসব প্রকল্পে বৈদেশিক উৎস থেকে প্রকল্প সাহায্য হিসেবে ১০ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা, সরকারি অর্থায়নে ৪ হাজার ৭১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়নে ৩ হাজার ৩৮১ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
তিনটি উৎস মিলিয়ে এসব প্রকল্পের মোট বরাদ্দ ১৮ হাজার ১০৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা।
বৈঠকে প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি এবং বিদ্যুৎ খাতের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা হয়।
ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা ৫০ পয়সা
বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প উৎস হিসেবে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিষয়টিও সংসদীয় কমিটির আলোচনায় উঠে আসে।
বৈঠকে জানানো হয়, ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনকারী গ্রাহকেরা ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাবেন।
ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে বর্তমানে কত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে, তার বিস্তারিত তথ্য আগামী বৈঠকে উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
এ ছাড়া কমিটির পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিভিন্ন বিষয়ে লিখিত প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়। এসব প্রশ্নের উত্তরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য পরবর্তী বৈঠকে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতের সুপারিশ
সংসদীয় কমিটির সভাপতি মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়।
বৈঠকে অংশ নেন কমিটির সদস্য ও মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, রফিকুল ইসলাম হিলালী, এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, নায়াব ইউসুফ আহমেদ, মমতাজ আলো, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান ও মো. আবুল হাসনাত।
এ সময় মন্ত্রণালয়ের সচিব, আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি পর্যালোচনা শেষে বিদ্যুৎ খাতের সার্বিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার সুপারিশ করে সংসদীয় কমিটি।



