বরিশাল মহানগরী ও জেলায় এক বছরের ব্যবধানে নথিভুক্ত অপরাধের সংখ্যা বেড়েছে ১৬০টি। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মহানগর ও জেলা মিলিয়ে ৪৭১টি অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মাদকসংক্রান্ত অপরাধই ২১৪টি। একই সময়ে চারটি হত্যা ও ১২টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে পুলিশ। অপরাধের এই পরিসংখ্যান সামনে আসার পর মাদক, সন্ত্রাস ও কিশোর গ্যাং দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন।
রোববার (১১ অক্টোবর) বরিশাল জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় পুলিশের উপস্থাপিত পরিসংখ্যানে এসব তথ্য উঠে আসে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মামুন খন্দকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় অপরাধ পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়।
এক বছরে অপরাধ বেড়েছে ৫১ শতাংশের বেশি
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বরিশাল মহানগর এলাকায় ১৪২টি এবং জেলা পুলিশের আওতাধীন এলাকায় ৩২৯টি অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। দুই এলাকার মোট অপরাধের সংখ্যা ৪৭১টি।
২০২৫ সালের একই মাসে মহানগর ও জেলায় মোট ৩১১টি অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছিল। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে অপরাধের সংখ্যা বেড়েছে ১৬০টি, যা প্রায় ৫১ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, চলতি বছরের আগস্টে নথিভুক্ত অপরাধের সংখ্যা ছিল ৪৬৬টি। সেপ্টেম্বর মাসে তা বেড়ে ৪৭১টিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ আগের মাসের তুলনায় পাঁচটি অপরাধ বেশি নথিভুক্ত হয়েছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, মাসিক হিসাবে অপরাধের সংখ্যা সামান্য বাড়লেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্য। তবে নথিভুক্ত অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে প্রকৃত অপরাধের প্রবণতা, মামলা গ্রহণের হার কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের প্রভাব কতটা রয়েছে, তা এই পরিসংখ্যান থেকে আলাদাভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
মাদকসংক্রান্ত অপরাধই ২১৪টি
সেপ্টেম্বর মাসে বরিশালের অপরাধ পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি নথিভুক্ত হয়েছে মাদকসংক্রান্ত ঘটনা।
মহানগর এলাকায় মাদকসংক্রান্ত ৫১টি এবং জেলা পুলিশের আওতাধীন এলাকায় ১৬৩টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে মাদকসংক্রান্ত অপরাধের সংখ্যা ২১৪টি।
এটি সেপ্টেম্বর মাসে নথিভুক্ত মোট ৪৭১টি অপরাধের প্রায় ৪৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
অর্থাৎ পুলিশের হিসাবে ওই মাসে নথিভুক্ত প্রতি ১০০টি অপরাধের মধ্যে প্রায় ৪৫টি ছিল মাদকসংক্রান্ত।
মাদকের পাশাপাশি হত্যা, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন ও চুরির ঘটনাও উঠে এসেছে পুলিশের প্রতিবেদনে।
এক মাসে চার খুন ও ১২ ধর্ষণ
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে বরিশাল মহানগর এলাকায় দুটি হত্যা ও পাঁচটি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
একই সময়ে জেলা পুলিশের আওতাধীন এলাকায় দুটি হত্যা ও সাতটি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়।
ফলে মহানগর ও জেলা মিলিয়ে মোট চারটি হত্যা এবং ১২টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
এ ছাড়া মহানগর এলাকায় নারী নির্যাতনের ১৬টি, চুরির ছয়টি এবং সিঁধেল চুরির তিনটি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
জেলা পুলিশের আওতাধীন এলাকায় নারী নির্যাতনের ২৭টি, চুরির ১২টি এবং সিঁধেল চুরির নয়টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
দুই এলাকার হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে নারী নির্যাতনের ঘটনা ৪৩টি, সাধারণ চুরি ১৮টি এবং সিঁধেল চুরি ১২টি।
এসব পরিসংখ্যানের পাশাপাশি অন্যান্য অপরাধও পুলিশের মাসিক প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
৯৯ ভ্রাম্যমাণ আদালতে ১৭৮ মামলা
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও বিভিন্ন আইন বাস্তবায়নে সেপ্টেম্বর মাসে বরিশাল জেলায় ৯৯টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসনের উপস্থাপিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসব অভিযানে ১৭৮টি মামলা করা হয়েছে। জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৮ লাখ ৭৪ হাজার ১৭০ টাকা।
একই সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৯৫ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ, সড়ক পরিবহন, নিরাপদ খাদ্য, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড এবং স্থানীয় সরকারসংক্রান্ত আইনসহ বিভিন্ন আইনে এসব অভিযান পরিচালিত হয়।
এ ছাড়া দণ্ডবিধি, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনেও অভিযান চালানো হয়েছে।
মাদকবিরোধী অভিযানে ৯৫ জনের কারাদণ্ড
ভ্রাম্যমাণ আদালতের পরিসংখ্যানেও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে শুধু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ৫৭টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়।
এসব অভিযানে ৯৩টি মামলা করা হয়েছে। জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৭০ হাজার ৭৮০ টাকা।
একই সঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পরিচালিত অভিযানে ৯৫ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ সেপ্টেম্বর মাসে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড পাওয়া ৯৫ জনের সবাই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় দণ্ডিত হয়েছেন বলে জেলা প্রশাসনের পরিসংখ্যানে উল্লেখ রয়েছে।
নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তা অধিকার আইনে বড় অঙ্কের জরিমানা
মাদকের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগেও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপদ খাদ্য আইনে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে জরিমানা আদায় করা হয়েছে এক লাখ ৯০ হাজার ৫০০ টাকা।
বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনে এক লাখ টাকা এবং সড়ক পরিবহন আইনে আট হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এ ছাড়া ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইনে ছয়টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ২৩টি মামলা করা হয়। এসব মামলায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
অন্যান্য আইনেও বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান ও জরিমানার তথ্য জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাস দমনে নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত
বরিশাল জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় মাদক, সন্ত্রাস, কিশোর গ্যাং এবং অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে অপরাধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো, নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সভায় অপরাধ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় বজায় রেখে কাজ করার বিষয়েও আলোচনা হয়।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মামুন খন্দকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভা সঞ্চালনা করেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উপমা ফারিসা।
সভায় উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার এ জেড এম মোস্তাফিজুর রহমান, অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার বেলাল হোসাইন, বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল আলম ফরিদ এবং বরিশাল প্রেসক্লাবের সভাপতি অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম খসরু।
এ ছাড়া সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা ও গণমাধ্যমকর্মীরা সভায় অংশ নেন।



