ছায়ানটে নৃত্যনাট্যে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিবন্দনা, মঞ্চে তুরঙ্গমী

‘বৃক্ষবন্দনা’ থেকে অনুপ্রাণিত ‘ধরা তরু কাব্য’-তে নৃত্য ও নাট্যভাষায় ফুটে উঠল বাংলার ছয় ঋতু ও মানুষ-প্রকৃতির সম্পর্ক

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বৃক্ষবন্দনা’ কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ঢাকার ছায়ানট মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হয়েছে বিশেষ নৃত্যনাট্য ‘ধরা তরু কাব্য—প্রকৃতির গল্প’। নৃত্য ও নাট্যভাষায় প্রকৃতি, মানুষ ও পরিবেশের সম্পর্ক তুলে ধরেছে বাংলাদেশের তুরঙ্গমী রেপার্টরি ড্যান্স থিয়েটার।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (আইজিসিসি) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বক্তব্য দেন।

ছয় ঋতুর আবহে প্রকৃতির গল্প

‘ধরা তরু কাব্য’ নৃত্যনাট্যে বাংলার ছয় ঋতুর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রকৃতির বিভিন্ন রূপ তুলে ধরা হয়। বসন্তের ফুল, গ্রীষ্মের উত্তাপ, বর্ষার বৃষ্টি থেকে শরৎ-হেমন্ত পেরিয়ে শীতের প্রকৃতি—নৃত্য, সংগীত ও নাট্যাভিনয়ের সমন্বয়ে মঞ্চে ফুটিয়ে তোলা হয় ঋতুচক্র।

রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিচেতনা এবং মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের ভাবনাকে কেন্দ্র করে সাজানো হয় পরিবেশনাটি।

‘মানুষের অস্তিত্বের মূল নির্যাস সংস্কৃতি’

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী দেশের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকার বিভিন্নভাবে সংস্কৃতির বিকাশ ও প্রসারে সহায়তা করছে।

ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশ ও ভারতের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তিতে রয়েছে অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সাহিত্য ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা।

তিনি বলেন, “মানুষের অস্তিত্বের মূল নির্যাস হলো সংস্কৃতি। যত দিন সংস্কৃতি টিকে থাকবে, তত দিন পৃথিবী টিকে থাকবে। আমাদের যে বন্ধন, তারও মূল হচ্ছে সংস্কৃতি।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন ও কবিরের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁদের রেখে যাওয়া সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই এ অঞ্চলের শক্তি।

রবীন্দ্রনাথ দুই দেশের অভিন্ন ঐতিহ্যের অংশ

দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশের মানুষের কাছেই বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন। তাঁর কবিতা, গান, দর্শন, ভালোবাসা ও প্রকৃতিচেতনা দুই দেশের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগসূত্র তৈরি করে রেখেছে।

রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিবিষয়ক ভাবনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, পরিবেশ নিয়ে বিশ্বজুড়ে বর্তমান উদ্বেগ শুরু হওয়ার বহু আগেই রবীন্দ্রনাথ মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক নিয়ে লিখেছেন।

ঋতুর সৌন্দর্য, বৃক্ষের উদারতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপনের প্রয়োজনীয়তা তাঁর লেখায় উঠে এসেছে বলে মন্তব্য করেন ভারতীয় হাইকমিশনার।

তুরঙ্গমীর পরিবেশনায় ‘ধরা তরু কাব্য’

নৃত্যনাট্যটি পরিবেশন করে তুরঙ্গমী রেপার্টরি ড্যান্স থিয়েটার। দলের নেতৃত্বে ছিলেন শিল্পনির্দেশক ও নৃত্যশিল্পী পূজা সেনগুপ্ত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করা পূজা ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ভারত সরকারের সাংস্কৃতিক বৃত্তির আওতায় ২০১৩ সালে তিনি ওই শিক্ষা সম্পন্ন করেন। তিনি ভরতনাট্যমে প্রশিক্ষিত।

পূজা সেনগুপ্ত বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সাংস্কৃতিক সংযোগের সঙ্গে দুই দেশের অভিন্ন নদী ও ভূপ্রকৃতিরও সম্পর্ক রয়েছে।

তাঁর ভাষায়, হিমালয় থেকে নেমে আসা একই নদী ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং একই পলি বহন করছে। এই নদীকেন্দ্রিক ভূপ্রকৃতি দুই দেশের সংস্কৃতির অনেক মিলের অন্যতম ভিত্তি।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী, নৃত্যশিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষার্থী ও তরুণ পেশাজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।

spot_img
spot_img

অধিক পঠিত

Related Articles