বিয়ে হয়ে গেলেই একজন নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতা বা নিজের শরীরের ওপর অধিকার শেষ হয়ে যায় না—বৈবাহিক ধর্ষণসংক্রান্ত মামলার শুনানিতে এমন মন্তব্য করেছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে বৈবাহিক ধর্ষণসংক্রান্ত একাধিক মামলার শুনানি শুরু হয়। আদালত জানিয়েছে, প্রথমে কর্নাটক হাইকোর্টের একটি রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলের শুনানি হবে। ওই মামলায় এক স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীকে কার্যত ‘যৌনদাসী’র মতো ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে।
আগে বর্তমান আইনের ব্যাখ্যা দেখবে আদালত
শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, বর্তমানে প্রচলিত আইন ব্যাখ্যা করে এমন ঘটনায় স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা চালানো সম্ভব কি না, প্রথমে সেটি দেখা হবে। এরপর বৈবাহিক ধর্ষণের ক্ষেত্রে আইনে থাকা ব্যতিক্রমের সাংবিধানিক বৈধতা পরীক্ষা করা হবে।
কর্নাটক হাইকোর্টের রায়ের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং বলেন, বিশেষ পরিস্থিতিতে আইনি ব্যতিক্রম থাকা সত্ত্বেও বর্তমান আইনকে বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করে স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা চালানো সম্ভব।
তিনি আদালতকে জানান, সংশ্লিষ্ট মামলায় স্ত্রীকে তাঁর স্বামী কার্যত ‘যৌনদাসী’র মতো ব্যবহার করেছিলেন। তবে বৈবাহিক ধর্ষণের আইনি ব্যতিক্রম সরাসরি বাতিল করার দাবি তিনি করছেন না বলেও জানান।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এ সময় প্রশ্ন তোলেন, কোনো আইনে যখন একটি নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম স্পষ্টভাবে রাখা হয়েছে, তখন সেটিকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব কি না, যাতে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় অভিযুক্ত স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা চালানো যায়।
সুপ্রিম কোর্টের সামনে দুটি প্রশ্ন
এই মামলায় প্রধানত দুটি বিষয় বিচার করবে সুপ্রিম কোর্ট।
প্রথমত, বৈবাহিক ধর্ষণের ক্ষেত্রে আইনে থাকা ব্যতিক্রমকে সীমিতভাবে ব্যাখ্যা করে বিশেষ পরিস্থিতিতে স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করা যাবে কি না।
দ্বিতীয়ত, বৈবাহিক ধর্ষণের এই ব্যতিক্রম সংবিধানসম্মত কি না এবং তা মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হলে বাতিল করা যাবে কি না।
‘নিজের শরীরের ওপর অধিকার শেষ হয় না’
শুনানিতে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, বিবাহিত নারীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ে হয়েছে বলে কারও ব্যক্তিস্বাধীনতা বা নিজের শরীরের ওপর অধিকার শেষ হয়ে যেতে পারে না।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, যেহেতু আদালত একটি ফৌজদারি আইনের বৈধতা ও প্রয়োগ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, তাই আগে বৈবাহিক ধর্ষণের ব্যতিক্রমটি অযৌক্তিক বা সংবিধানবিরোধী কি না, তা বিচার করতে হবে।
বিচারপতি বাগচী আরও বলেন, বৈবাহিক ধর্ষণের আইনি ব্যতিক্রম থাকার অর্থ এই নয় যে যৌন সহিংসতার ঘটনায় স্বামী সব ধরনের ফৌজদারি দায় থেকে মুক্ত থাকবেন। যৌন সহিংসতায় গুরুতর আঘাত বা মৃত্যু হলে অন্য ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
নির্ভয়া ঘটনার পর পরিবর্তিত হয়েছিল আইন
শুনানিতে ২০১২ সালের নির্ভয়া ঘটনার পর ভারতে ধর্ষণসংক্রান্ত আইনে আনা পরিবর্তনের বিষয়ও উঠে আসে। ওই সময় ধর্ষণের সংজ্ঞা বিস্তৃত করা হয়েছিল এবং বিভিন্ন ধরনের অনুপ্রবেশমূলক যৌন সহিংসতাকে এর আওতায় আনা হয়।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী করুণা নন্দী আদালতকে বলেন, বিবাহিত সম্পর্কের মধ্যে অন্যান্য ধরনের যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রেও বৈবাহিক ধর্ষণের আইনি ব্যতিক্রমের প্রভাব রয়েছে। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা বাদ যাওয়ার পর এ ধরনের ঘটনায় আইনি প্রতিকারের প্রশ্নও তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রের বক্তব্যও শুনবে সুপ্রিম কোর্ট
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানান, বৈবাহিক ধর্ষণসংক্রান্ত মামলায় সরকার আইনি বিষয়ে আদালতকে সহায়তা করবে। এ বিষয়ে কেন্দ্র আগে যে জবাব জমা দিয়েছে, তার ভিত্তিতেই বক্তব্য উপস্থাপন করা হবে।
আদালত কেন্দ্রের জবাবের কপি দুই দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সব আইনজীবীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। চূড়ান্ত শুনানির আগে সব পক্ষকে প্রয়োজনীয় নথি ও বক্তব্য প্রস্তুত রাখতেও বলা হয়েছে।
দিল্লি হাইকোর্টের বিভক্ত রায়ের পর সুপ্রিম কোর্টে
বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে কি না—এই প্রশ্নটি সুপ্রিম কোর্টে আসে মূলত দিল্লি হাইকোর্টের ২০২২ সালের বিভক্ত রায়ের পর।
২০২২ সালের ১১ মে দিল্লি হাইকোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চ এ বিষয়ে ভিন্নমত দেন। বিচারপতি রাজীব শকধর বৈবাহিক ধর্ষণের আইনি ব্যতিক্রম বাতিলের পক্ষে মত দেন, আর বিচারপতি সি হরি শঙ্কর তা বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নেন।
সুপ্রিম কোর্ট এখন প্রথমে কর্নাটক হাইকোর্টের মামলায় বর্তমান আইনের ব্যাখ্যার প্রশ্নটি বিচার করবে। এরপর বৈবাহিক ধর্ষণের ব্যতিক্রম সংবিধানসম্মত কি না, সেই প্রশ্নেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে এগোবে।



