চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় ছোট্ট একটি সোনালি মূর্তি কখনো একজন শিল্পীর কয়েক দশকের সাধনার স্বীকৃতি, কখনো বিতর্কের কেন্দ্র, আবার কখনো বদলে দেয় তার ক্যারিয়ারের গতিপথ। হলিউডের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সেই পুরস্কার—অস্কার।
বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত চলচ্চিত্র পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক নাম আসলে ‘অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড অব মেরিট’। অথচ সেই নাম ছাপিয়ে ‘অস্কার’ এতটাই প্রতিষ্ঠিত যে সোনালি মূর্তিটি এখন চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ স্বীকৃতির বৈশ্বিক প্রতীক।
১৯২৯ সালে প্রথম অস্কার দেওয়ার পর প্রায় এক শতাব্দী কেটে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে বদলেছে হলিউড, সিনেমা তৈরির প্রযুক্তি, দর্শক এবং পুরস্কার দেওয়ার রীতিনীতি। কিন্তু প্রায় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে তলোয়ার হাতে ফিল্ম রিলের ওপর দাঁড়ানো সেই সোনালি নাইট।
যেভাবে জন্ম অস্কার মূর্তির
অ্যাকাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৭ সালে। সংগঠনটি চলচ্চিত্রে অসাধারণ কৃতিত্বকে সম্মান জানানোর জন্য বার্ষিক পুরস্কার চালুর সিদ্ধান্ত নেয়।
এরপর এমজিএমের প্রধান শিল্পনির্দেশক সেড্রিক গিবন্স একটি ট্রফির নকশা করেন। তার নকশায় ছিল ফিল্মের রিলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এবং হাতে তলোয়ার ধরা এক নাইট।
লস অ্যাঞ্জেলেসের ভাস্কর জর্জ স্ট্যানলি সেই নকশাকে ত্রিমাত্রিক মূর্তিতে রূপ দেন। জন্ম হয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ট্রফিগুলোর একটির।
১৯২৯ সালের ১৬ মে হলিউড রুজভেল্ট হোটেলে প্রথম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস অনুষ্ঠিত হয়। সেই অনুষ্ঠান ছিল বর্তমান অস্কারের চাকচিক্যের তুলনায় বিস্ময়করভাবে সংক্ষিপ্ত।
প্রথমবার সেরা অভিনেতার পুরস্কার পান জার্মান অভিনেতা এমিল ইয়ানিংস।
‘অস্কার’ নামটি এলো কোথা থেকে?
মূর্তিটির নাম কেন ‘অস্কার’ হলো, তার নিশ্চিত উত্তর আজও নেই। এ নিয়ে হলিউডে একাধিক গল্প প্রচলিত।
সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পটির কেন্দ্রে রয়েছেন অ্যাকাডেমির তৎকালীন গ্রন্থাগারিক এবং পরবর্তী সময়ের নির্বাহী পরিচালক মার্গারেট হেরিক।
প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, মূর্তিটি দেখে হেরিক মন্তব্য করেছিলেন, এটি দেখতে তার ‘আঙ্কেল অস্কার’-এর মতো। সেখান থেকেই নাকি ডাকনামটির জন্ম।
তবে এটিই যে নামকরণের নিশ্চিত ইতিহাস, তা অ্যাকাডেমিও দাবি করে না।
১৯৩৪ সালের মধ্যেই ‘অস্কার’ নামটি সংবাদপত্রে ব্যবহৃত হচ্ছিল। হলিউড কলামিস্ট সিডনি স্কলস্কি ক্যাথরিন হেপবার্নের প্রথম সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার নিয়ে লেখার সময় নামটি ব্যবহার করেন। ১৯৩৯ সালে অ্যাকাডেমি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অস্কার’ ডাকনামটি গ্রহণ করে।
সোনালি মূর্তির ওজন প্রায় ৪ কেজি
দেখতে খুব বড় না হলেও অস্কার হাতে নিলে এর ওজন টের পাওয়া যায়।
অ্যাকাডেমির তথ্য অনুযায়ী, মূর্তিটির উচ্চতা সাড়ে ১৩ ইঞ্চি বা প্রায় ৩৪ সেন্টিমিটার এবং ওজন সাড়ে ৮ পাউন্ড বা প্রায় ৩ দশমিক ৯ কেজি।
মূর্তির নিচের ফিল্ম রিলে পাঁচটি স্পোক রয়েছে। এগুলো অ্যাকাডেমির মূল পাঁচটি শাখার প্রতীক—অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক, টেকনিশিয়ান ও লেখক।
বর্তমান অস্কার মূর্তি কঠিন ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরি করে তার ওপর ২৪ ক্যারেট সোনার প্রলেপ দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ধাতুর সংকট দেখা দিলে তিন বছর মূর্তিগুলো রং করা প্লাস্টার দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হলে বিজয়ীদের সেই প্লাস্টারের মূর্তি ফেরত দিয়ে সোনার প্রলেপ দেওয়া ধাতব মূর্তি নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
তৈরি হয় নিউইয়র্কে
অস্কার মূর্তি তৈরির কাজও বেশ সময়সাপেক্ষ। বর্তমানে নিউইয়র্কের হাডসন ভ্যালির ইউএপি পোলিচ ট্যালিক্স ফাইন আর্ট ফাউন্ড্রিতে এগুলো তৈরি হয়।
প্রথমে মোমের আদলে মূর্তি তৈরি করা হয়। এরপর বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে ব্রোঞ্জে ঢালাই এবং শেষে ২৪ ক্যারেট সোনার প্রলেপ দেওয়া হয়।
প্রতিটি অস্কারের নিজস্ব ক্রমিক নম্বরও থাকে।
অ্যাকাডেমির হিসাবে, ৫০টি মূর্তি তৈরির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় তিন মাস লাগে।
বানাতে শত শত ডলার, কিন্তু বিক্রিমূল্য মাত্র ১ ডলার?
অস্কারের অর্থনৈতিক মূল্য নিয়ে রয়েছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের হিসাবে, একটি অস্কার মূর্তি তৈরিতে আনুমানিক ৪০০ ডলার খরচ হয়। কিন্তু বিজয়ী চাইলেই সেটি নিলামে তুলে লাখ লাখ ডলারে বিক্রি করতে পারেন না।
১৯৫১ সালের পর দেওয়া অস্কারের ক্ষেত্রে অ্যাকাডেমির বিশেষ নিয়ম রয়েছে। বিজয়ী বা তার উত্তরাধিকারীরা মূর্তিটি বিক্রি বা অন্যভাবে হস্তান্তর করতে চাইলে প্রথমে অ্যাকাডেমিকে মাত্র ১ ডলারে সেটি কেনার সুযোগ দিতে হবে।
ফলে মূর্তিটির বাজারমূল্য কার্যত নিয়ন্ত্রিত।
কিন্তু একটি অস্কার জয়ের পেশাগত মূল্য একেবারেই ভিন্ন। পুরস্কার জয়ের পর কোনো কোনো অভিনেতা, পরিচালক বা চলচ্চিত্রকর্মীর পারিশ্রমিক ও পেশাগত সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
অন্যদিকে পুরস্কারের প্রচারণায় স্টুডিওগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করে। অস্কার মৌসুমকে ঘিরে প্রচারণা, পরামর্শক, গণমাধ্যম, ফ্যাশন, অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য খাত মিলিয়ে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠেছে।
অস্কার মানেই কি সেরা?
অস্কারের ইতিহাস যেমন গৌরবের, তেমনি বিতর্কেরও।
চলচ্চিত্র ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা ও নির্মাতা কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি পাননি। ‘সিটিজেন কেইন’ ও ‘ব্রোকব্যাক মাউন্টেন’ সেরা চলচ্চিত্র হতে পারেনি। ‘২০০১: আ স্পেস ওডিসি’ এবং ‘ডু দ্য রাইট থিং’-এর মতো চলচ্চিত্রও সেরা চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়ন পায়নি।
খ্যাতিমান নির্মাতা ডেভিড লিঞ্চও কখনো প্রতিযোগিতামূলক অস্কার জিততে পারেননি।
অন্যদিকে বিভিন্ন সময় এমন চলচ্চিত্র পুরস্কৃত হয়েছে, যেগুলোকে ঘিরে পরে তীব্র বিতর্ক হয়েছে।
এসব কারণেই অস্কারকে একদিকে চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান হিসেবে দেখা হয়, অন্যদিকে এর ভোটাভুটি, প্রচারণা, অর্থ ও প্রভাবের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
বদলেছে অ্যাকাডেমিও
সময়ের সঙ্গে অস্কার এবং এর পেছনের প্রতিষ্ঠানকেও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
১৯৬৯ সালে তরুণ অভিনেত্রী ক্যান্ডিস বার্গেন অ্যাকাডেমিতে নতুন প্রজন্মের সদস্য অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগে যুক্ত হয়েছিলেন। এর মাধ্যমে ডেনিস হপারের মতো তুলনামূলক তরুণ চলচ্চিত্রকর্মীরা সদস্য হওয়ার সুযোগ পান।
২০১৫ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘অস্কারস সো হোয়াইট’ আন্দোলন শুরু হলে অ্যাকাডেমির সদস্যদের জাতিগত ও লিঙ্গগত বৈচিত্র্য নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। এরপর সদস্যপদে বৈচিত্র্য বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
দর্শকসংখ্যাও বছরের পর বছর ওঠানামা করেছে। অস্কার অনুষ্ঠান প্রথম টেলিভিশনে সম্প্রচার হয় ১৯৫৩ সালে। এরপর এটি বিশ্বের অন্যতম আলোচিত বিনোদন অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে।
বিতর্কের পরও অস্কারের আকর্ষণ অটুট
অস্কার কখনো নিখুঁতভাবে চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করতে পেরেছে—এমন দাবি করা কঠিন। এর ইতিহাসে উপেক্ষা, ভুল সিদ্ধান্ত, বিতর্ক এবং পরিবর্তনের দাবি বারবার এসেছে।
তারপরও চলচ্চিত্রজগতে অস্কারের প্রতীকী শক্তি প্রায় অক্ষুণ্ন রয়েছে।
১৩ দশমিক ৫ ইঞ্চি উচ্চতার একটি সোনালি মূর্তি হাতে নেওয়ার মুহূর্ত এখনো অভিনেতা, নির্মাতা ও চলচ্চিত্রকর্মীদের কাছে ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অর্জন।
মাত্র কয়েকশ ডলারে তৈরি এবং নিয়ম অনুযায়ী কার্যত ১ ডলারের পুনর্বিক্রয়মূল্যের একটি মূর্তিই তাই কোনো শিল্পীর কাছে হয়ে উঠতে পারে অমূল্য।
প্রায় এক শতাব্দী ধরে এই বৈপরীত্যই সম্ভবত অস্কারের সবচেয়ে বড় রহস্য—এর বস্তুগত মূল্য সামান্য, কিন্তু চলচ্চিত্রের জগতে এর প্রতীকী মূল্য পরিমাপ করা প্রায় অসম্ভব।



