হামে আক্রান্ত ৫৯ শতাংশ শিশুর সংক্রমণ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে: গবেষণা

২০০ আক্রান্ত শিশুর ১৬৭ জনের টিকা নেওয়া ছিল না; গুরুতর জটিলতার সঙ্গে অপুষ্টির সম্পর্ক পেয়েছেন গবেষকরা

চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও কক্সবাজারে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ২০০ শিশুর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতালে হামে সংক্রমিত হয়েছে।

গবেষণায় আক্রান্ত শিশুদের গুরুতর অসুস্থতার পেছনে অপুষ্টিকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আক্রান্তদের ৩১ শতাংশ তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সম্মেলন কক্ষে ‘বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে হামের প্রাদুর্ভাব: রোগের বিস্তার, উপসর্গ, জেনেটিক বিশ্লেষণ ও মা-শিশুর অ্যান্টিবডির অবস্থা’ শীর্ষক গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়।

এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন গবেষণাটি পরিচালনা করে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মা ও শিশু হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ২০০ শিশু ও তাদের ১০০ জন মায়ের তথ্য এতে বিশ্লেষণ করা হয়।

আক্রান্তদের ১৬৭ জনের টিকা নেওয়া ছিল না

গবেষণায় দেখা যায়, হামে আক্রান্ত ২০০ শিশুর মধ্যে ১৬৭ জনের টিকা নেওয়া ছিল না। তবে তাদের মধ্যে ৯১ জন তখনো নিয়মিত টিকাদানের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছায়নি।

আক্রান্ত শিশুদের ৪৬ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। সামগ্রিকভাবে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত শিশুদের বয়স ছিল দুই মাস থেকে ১১ বছর পর্যন্ত।

গবেষণার প্রধান গবেষক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামরুন নাহার জানান, টিকা না নেওয়া শিশুদের ৫২ শতাংশ অসচেতনতা বা তারিখ ভুলে যাওয়ার কারণে টিকা পায়নি। ৩০ শতাংশ শিশু অসুস্থ থাকায়, ৮ শতাংশ মায়ের অসুস্থতার কারণে এবং বাকিরা টিকা নিয়ে ভয় কিংবা টিকার কার্ড হারানোর কারণে বাদ পড়েছে।

হাসপাতালেই সংক্রমিত ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ

গবেষণায় অংশ নেওয়া সংক্রমিত শিশুদের ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতাল থেকে হামে আক্রান্ত হয়েছে।

কামরুন নাহার বলেন, হাসপাতালগুলোতে শয্যার স্বল্পতার কারণে একই শয্যায় একাধিক শিশুকে রাখতে হচ্ছে, যা সংক্রমণ ছড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিয়া জানান, অনেক রোগী হাম শনাক্ত হওয়ার আগে বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে সাধারণ ওয়ার্ডে থাকে। তাদের সংস্পর্শ থেকে অন্য রোগীরাও সংক্রমিত হচ্ছে।

গবেষণায় ৩২ শিশুর ক্ষেত্রে আগে হামে আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসার তথ্যও পাওয়া গেছে।

অপুষ্টিতে বাড়ছে গুরুতর জটিলতা

গবেষণায় আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৩১ শতাংশের মধ্যে তীব্র পুষ্টিহীনতা পাওয়া গেছে। মাত্র ৬৩ শিশু বা ৩২ শতাংশ গত ছয় মাসে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পেয়েছিল।

কামরুন নাহার জানান, ভিটামিন ‘এ’ না পাওয়া শিশুদের ৫৯ শতাংশের মধ্যে মারাত্মক ও তীব্র জটিলতা দেখা গেছে।

তথ্য বিশ্লেষণে মাঝারি বা তীব্র পুষ্টিহীনতা, গ্রাম বা বস্তি এলাকায় বসবাস, দারিদ্র্য, অতিরিক্ত জনবহুল ঘর এবং ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবকে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত পাওয়া গেছে।

গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ গ্রামীণ এলাকার এবং ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ নিম্ন আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবারের।

নতুন ধরনের ভাইরাস পাওয়া যায়নি

গবেষকরা ১৭ জন হাম রোগীর নমুনার জিনগত বিন্যাস বিশ্লেষণ করে প্রত্যেকের নমুনাতেই ‘বি-থ্রি’ ধরন শনাক্ত করেছেন। নতুন কোনো আমদানি হওয়া ধরন শনাক্ত হয়নি।

গবেষকদের মতে, শনাক্ত হওয়া ধরনটি টিকার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কামরুন নাহার বলেন, ৯৫ শতাংশ টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, টিকা নেওয়া শিশুদের তুলনায় টিকা না নেওয়া শিশুদের গুরুতর জটিলতায় ভোগার আশঙ্কা প্রায় দ্বিগুণ ছিল। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত যেসব শিশু হামের টিকা নিয়েছিল, তাদের মধ্যে কারও মৃত্যু হয়নি।

টিকা ও পৃথক চিকিৎসাব্যবস্থার সুপারিশ

গবেষকরা হাম নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টিকাদানের মাধ্যমে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা, বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে টিকা দেওয়া, ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহ ও শিশুদের পুষ্টির উন্নয়নের সুপারিশ করেছেন।

একই সঙ্গে টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি এমন শিশুদের দ্রুত রোগ শনাক্ত ও পৃথক রাখার ব্যবস্থা এবং হাসপাতালগুলোতে পৃথকীকরণ সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রামে হাম রোগীদের চিকিৎসায় আলাদা হাসপাতাল চালুর প্রস্তাবও এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় আক্রান্ত রোগীদের অন্য রোগীদের কাছ থেকে পৃথক রাখার ব্যবস্থা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ।

 

spot_img
spot_img

অধিক পঠিত

Related Articles