দিনাজপুরের শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য অনুসরণ করে শ্রী শ্রী কান্তজীউ বিগ্রহের নদীপথে যাত্রা শুরু হয়েছে। পূজা-অর্চনা, নামকীর্তন এবং হাজারো ভক্তের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সকালে কাহারোল উপজেলার ঐতিহাসিক কান্তনগর মন্দির থেকে দিনাজপুর শহরের রাজবাড়ী মন্দিরের উদ্দেশে যাত্রা করে রাধা-কৃষ্ণের যুগল বিগ্রহ।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৭৪ বছর ধরে দিনাজপুর রাজ পরিবারের প্রাচীন রীতি অনুসরণ করে এই আয়োজন হয়ে আসছে। প্রতিবছর জন্মাষ্টমীর দুই দিন আগে কান্তনগর মন্দির থেকে কান্তজীউ বিগ্রহ রাজবাড়ী মন্দিরে নিয়ে আসা হয়।
১৮ নৌকার বহরে ২৪ কিলোমিটার যাত্রা
বুধবার সকালে কান্তনগর মন্দিরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের আয়োজন। পূজা, অর্চনা ও নামকীর্তন শেষে রাধা-কৃষ্ণের যুগল বিগ্রহকে বিশেষভাবে সাজানো নৌযানে তোলা হয়।
এরপর প্রায় ১৮টি নৌকার বহর নিয়ে ঢেপা নদী দিয়ে শুরু হয় প্রায় ২৪ কিলোমিটারের যাত্রা। প্রায় আট ঘণ্টা নদীপথে চলার পর বিগ্রহবাহী নৌযানটির দিনাজপুর শহরের সাধুরঘাটে পৌঁছানোর কথা।
এই দীর্ঘ যাত্রাকে কেন্দ্র করে ঢেপা নদীর দুই তীরে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন স্থান থেকে আসা নারী-পুরুষ ও শিশু নদীর তীরে অবস্থান নিয়ে বিগ্রহবাহী নৌযানের অপেক্ষা করেন।
শতাধিক ঘাটে হাজারো ভক্ত
কান্তনগর থেকে দিনাজপুর শহর পর্যন্ত নদীপথের শতাধিক ঘাটে হাজারো ভক্ত সমবেত হন। নৌবহর ঘাট অতিক্রম করার সময় তারা কান্তজীউ বিগ্রহকে বরণ করে নেন।
ভক্তদের কেউ ফল ও অন্যান্য উপকরণ উৎসর্গ করেন, কেউ প্রার্থনায় অংশ নেন। প্রসাদ গ্রহণের পাশাপাশি নিজেদের পরিবার ও সমাজের মঙ্গল কামনা করেন তারা।
ভক্তদের বিশ্বাস, কান্তজীউ বিগ্রহ দর্শন ও পূজার মাধ্যমে মনোবাসনা পূরণ এবং পরিবারের কল্যাণ লাভ হয়।
সাধুরঘাট থেকে শোভাযাত্রায় রাজবাড়ী মন্দিরে
প্রায় আট ঘণ্টার নদীপথের যাত্রা শেষে বিগ্রহবাহী নৌবহর সাধুরঘাটে পৌঁছালে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সেটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর কথা রয়েছে।
সেখান থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে কান্তজীউ বিগ্রহ নিয়ে যাওয়া হবে দিনাজপুরের রাজবাড়ী মন্দিরে।
রাজ পরিবারের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, জন্মাষ্টমীর আগে কান্তনগর থেকে রাজবাড়ী মন্দিরে আসার পর প্রায় তিন মাস সেখানে অবস্থান করবে বিগ্রহ। রাসপূর্ণিমার সময় আবার একইভাবে নদীপথে কান্তনগর মন্দিরে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।
৪৬ ঘাটে নিরাপত্তা ব্যবস্থা
কান্তজীউ বিগ্রহের নদীপথে যাত্রাকে কেন্দ্র করে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন।
কাহারোল সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, যাত্রা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করতে নদীপথের ৪৬টি ঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
একই সঙ্গে পুরো যাত্রাপথে সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ধর্মীয় আয়োজনকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি সম্প্রীতির মিলনমেলা
কান্তজীউ বিগ্রহের এই ঐতিহ্যবাহী যাত্রাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর দিনাজপুরের বিস্তীর্ণ এলাকায় উৎসবের আবহ তৈরি হয়। শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বী নয়, বিভিন্ন ধর্ম ও শ্রেণি-পেশার মানুষও নদীর দুই তীরে এই আয়োজন দেখতে সমবেত হন।
দীর্ঘদিনের এই ধর্মীয় ঐতিহ্য স্থানীয়ভাবে সামাজিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও মিলনমেলার উপলক্ষ হিসেবেও পরিচিত।



