প্যারিসের রাস্তায় বর্ণাঢ্য গণেশ চতুর্থীর শোভাযাত্রা

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব গণেশ চতুর্থীর বার্ষিক শোভাযাত্রা। বর্ণাঢ্য রথ, ধর্মীয় সংগীত, নৃত্য ও ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠানে প্যারিসের লা শাপেল এলাকা এদিন হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।

রোববার (৩০ আগস্ট) প্যারিসের শ্রী মানিকা বিনায়ক আলায়াম মন্দিরের উদ্যোগে বার্ষিক গণেশ উৎসবের আয়োজন করা হয়। প্যারিস ট্যুরিজম অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ১৮তম অ্যারোঁদিসমঁতে অবস্থিত মন্দিরটি ফ্রান্সের গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু উপাসনালয়গুলোর একটি। লা শাপেল এলাকার দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গেও মন্দিরটির দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে।

বর্ণাঢ্য রথে গণেশের প্রতিমা

মন্দিরে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শোভাযাত্রা শুরু হয়। ফুল ও বিভিন্ন সাজসজ্জায় সজ্জিত রথে স্থাপন করা হয় গণেশের প্রতিমা।

রথের সঙ্গে শোভাযাত্রায় অংশ নেন বিপুলসংখ্যক ভক্ত। নৃত্যশিল্পী, গায়ক ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের অংশগ্রহণে পুরো আয়োজন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ধর্মীয় সংগীত ও বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে শোভাযাত্রা এগিয়ে যায় প্যারিসের বিভিন্ন সড়ক দিয়ে।

শোভাযাত্রার পথে ভক্তদের মধ্যে মিষ্টি ও প্রসাদ বিতরণ করা হয়। গণেশের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও আশীর্বাদ কামনায় বিভিন্ন বয়সী মানুষ এতে অংশ নেন।

রথের সামনে নারকেল ভাঙার ঐতিহ্য

প্যারিসের গণেশ উৎসবের অন্যতম দৃশ্যমান ধর্মীয় আচার হলো রথের সামনে নারকেল ভাঙা। শোভাযাত্রা এগিয়ে যাওয়ার সময় ভক্তরা রাস্তায় নারকেল ভেঙে গণেশের উদ্দেশে নিবেদন করেন।

প্যারিস ট্যুরিজম অফিসের গণেশ উৎসবের বিবরণেও এই রীতির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ রয়েছে।

হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতিতে নারকেলকে পবিত্র নিবেদন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিভিন্ন পূজা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে দেবতার উদ্দেশে নারকেল নিবেদন ও ভাঙার প্রচলন রয়েছে। গণেশ উৎসবেও বাধা-বিপত্তি দূর এবং মঙ্গল কামনার প্রতীকী আচার হিসেবে এই রীতি অনুসরণ করেন ভক্তরা।

প্যারিসের রাস্তায় দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতির আবহ

গণেশ চতুর্থী ধর্মীয় উৎসব হলেও প্যারিসে এর বার্ষিক শোভাযাত্রা সময়ের সঙ্গে একটি পরিচিত সাংস্কৃতিক আয়োজনেও পরিণত হয়েছে।

লা শাপেল ও আশপাশের এলাকায় ভারতীয়, শ্রীলঙ্কানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। ফলে শোভাযাত্রায় ধর্মীয় আচারের পাশাপাশি দক্ষিণ এশীয় পোশাক, সংগীত, নৃত্য ও খাদ্যসংস্কৃতিরও উপস্থিতি দেখা যায়।

এবারের শোভাযাত্রা লা শাপেল ও মার্কস দোরমোয়া এলাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পথের দুই পাশে দাঁড়িয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরাও বর্ণাঢ্য আয়োজন প্রত্যক্ষ করেন।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ে আয়োজন

প্যারিসে গণেশের এই শোভাযাত্রা আকস্মিক বা অননুমোদিত কোনো আয়োজন নয়। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত পথে বার্ষিক শোভাযাত্রাটি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি এবং রাস্তায় ধর্মীয় আচার পালনের কারণে শোভাযাত্রার ব্যবস্থাপনায় বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

নারকেল ভাঙাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার এবং প্রসাদ বিতরণের কারণে সড়কে তৈরি হওয়া আবর্জনা পরিষ্কারের ব্যবস্থাও করেন আয়োজকরা। অনুষ্ঠান শেষে সংশ্লিষ্ট সড়ক পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

কয়েক দশকের পরিচিত আয়োজন

প্যারিসের লা শাপেল এলাকায় গণেশ উৎসব কয়েক দশক ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। শ্রী মানিকা বিনায়ক আলায়াম মন্দিরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই আয়োজন বর্তমানে ফ্রান্সে বসবাসরত হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম দৃশ্যমান বার্ষিক ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে।

হিন্দু ধর্মে গণেশকে জ্ঞান, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের দেবতা এবং বাধা অপসারণকারী হিসেবে পূজা করা হয়। গণেশ চতুর্থী উপলক্ষে ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পূজা, প্রার্থনা ও শোভাযাত্রার আয়োজন করেন।

বহু সংস্কৃতির শহর প্যারিসেও সেই ধর্মীয় ঐতিহ্য এখন নিয়মিতভাবে প্রকাশ্য পরিসরে উদ্‌যাপিত হচ্ছে। দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি প্যারিসের বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবেও লা শাপেলের গণেশ উৎসব পরিচিতি পেয়েছে।

spot_img
spot_img

অধিক পঠিত

Related Articles