স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে ইসিতে জামায়াতের ৯ দফা দাবি

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে নয় দফা প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির গুরুত্বপূর্ণ দাবির মধ্যে রয়েছে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বহাল রাখা, সরকার কর্তৃক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের পদধারীদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা এবং রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া স্থানীয় সরকার প্রশাসকদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না দেওয়া।

একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. শামসুল আলমের নিয়োগ বাতিল এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রচারে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ বন্ধ করার দাবিও জানিয়েছে দলটি।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন ও অন্য নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে বৈঠকে এসব দাবি তুলে ধরে জামায়াতের ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদল।

প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। বৈঠকের পর সাংবাদিকদের তিনি জানান, নয় দফা দাবি লিখিতভাবে কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাদ দেওয়ার প্রস্তাবে আপত্তি

জামায়াতের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ দাবি হচ্ছে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বহাল রাখা।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে ৩০ হাজারের বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা অতীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পেরেছেন।

তার বক্তব্য, একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্য থাকবেন, অথচ ইউনিয়ন পরিষদ বা অন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না—এটি বৈষম্যমূলক।

তিনি দাবি করেন, এ ধরনের বিধিনিষেধ সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে বর্ণিত সমতা ও বৈষম্যহীনতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

পরওয়ার বলেন, “একজন ব্যক্তি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন, কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না—এটা বৈষম্যমূলক। আমরা এই সুপারিশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছি।”

নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার আইন সংশোধনের যে প্রস্তাব সরকারকে পাঠিয়েছে, তাতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থিতার অযোগ্যতার তালিকায় রাখার সুপারিশ ছিল। এ কারণেই জামায়াত বিষয়টি নিয়ে গত জুলাই থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছে।

নিষিদ্ধ দলের পদধারীদের নির্বাচনে না রাখার দাবি

জামায়াতের আরেকটি দাবি হচ্ছে—যেসব রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম সরকার নিষিদ্ধ করেছে, সেই দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতাদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়া।

দলটির যুক্তি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হলেও নির্বাচন নিজেই একটি রাজনৈতিক কার্যক্রম। ফলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো দলের পদধারী নির্বাচনে অংশ নিলে সেটিকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে গণ্য করা উচিত।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “যেসব রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ, সেই দলের কোনো নেতা বা পদধারী ব্যক্তি স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিলে সেটিকে রাজনৈতিক কার্যক্রম হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।”

এই দাবি মূলত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাদের লক্ষ্য করেই করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম উল্লেখ করেছে।

এর আগে ৩০ জুন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের খসড়া আচরণবিধির ওপর মতামত দিতে গিয়ে জামায়াত একই দাবি নির্বাচন কমিশনের কাছে জানিয়েছিল। তবে কমিশন সেই প্রস্তাব চূড়ান্ত সংশোধনী সুপারিশে অন্তর্ভুক্ত করেনি।

রাজনৈতিক প্রশাসকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না দেওয়ার দাবি

সাম্প্রতিক সময়ে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে জামায়াত।

দলটির অভিযোগ, এ ধরনের প্রশাসকরা সরকারি পদ ও সম্পদ ব্যবহার করে স্থানীয় নির্বাচনের আগে নিজেদের জন্য সুবিধাজনক রাজনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারেন।

এ কারণে যারা এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণার দাবি জানিয়েছে জামায়াত।

দলটির অবস্থান হলো, তফসিল ঘোষণার পর প্রশাসকের পদ থেকে পদত্যাগ করলেও তাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।

গোলাম পরওয়ার বলেন, রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের প্রশাসক করার মাধ্যমে নির্বাচনী মাঠে অসম সুবিধা তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, “আমাদের আশঙ্কা, এসব নিয়োগের মাধ্যমে তাঁদের স্থানীয় নির্বাচনের মাঠ প্রস্তুতের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।”

মন্ত্রী-এমপিদের প্রচারে নিষেধাজ্ঞা চায় জামায়াত

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে থাকা ব্যক্তিরা যেন প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালাতে না পারেন, সে দাবিও জানিয়েছে জামায়াত।

দলটির মতে, ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী ও এমপিরা নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিলে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর প্রভাব পড়তে পারে এবং প্রার্থীদের মধ্যে সমান সুযোগ নষ্ট হতে পারে।

এ কারণে আচরণবিধিতে এ বিষয়ে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রাখার দাবি করেছে দলটি।

ইসির অতিরিক্ত সচিব শামসুল আলমের নিয়োগ বাতিলের দাবি

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. শামসুল আলমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে জামায়াত।

দলটির অভিযোগ, তিনি অতীতে বিএনপির একটি নির্বাচন-সংক্রান্ত কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে তার দায়িত্ব পালন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে বলে মনে করছে জামায়াত।

গোলাম পরওয়ার বলেন, “একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে এমন নিয়োগ থাকা উচিত নয়, যা প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করে।”

জামায়াত শামসুল আলমের নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়েছে। নির্বাচন কমিশন তাদের জানিয়েছে, এ বিষয়ে দলটির উদ্বেগ সরকারের কাছে জানানো হবে।

তবে শামসুল আলমের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে জামায়াতের অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে পাওয়া যায়নি।

নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়েও তাদের মধ্যে কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তার অভিযোগ, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্য এবং কমিশনের অবস্থানের মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, কমিশনের কথাবার্তা ও আচরণ দেখে কোনো রাজনৈতিক সরকারের চাপ রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও তাদের মনে তৈরি হয়েছে।

তবে তিনি বলেন, এখনো নির্বাচন বর্জনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

“এ মুহূর্তে নির্বাচন বর্জনের কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। আমরা এখনো আশাবাদী। আমরা চাই নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করুক এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করুক,” বলেন গোলাম পরওয়ার।

পাঁচ স্তরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন

নির্বাচন কমিশন ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন—এই পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইসির তথ্যমতে, দেশে ১৩টি সিটি করপোরেশন, প্রায় ৫০০ উপজেলা পরিষদ, ৬১ জেলা পরিষদ এবং ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। দীর্ঘ সময় নির্বাচন না হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে নির্বাচনের উপযোগী হয়ে পড়েছে।

কমিশনের খসড়া আচরণবিধিতে পোস্টার নিষিদ্ধ রাখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার নিয়ন্ত্রণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মিথ্যা বা বিকৃত প্রচার নিষিদ্ধ করা এবং প্রচারের সময়সীমা কমানোর মতো বেশ কিছু বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।

কমিশন একই সঙ্গে এমপিওভুক্ত শিক্ষক, দ্বৈত নাগরিক, ঋণখেলাপি, ঋণখেলাপির জামিনদার এবং লাভজনক সরকারি পদে থাকা ব্যক্তিদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অযোগ্য করার সুপারিশ করেছে।

স্থানীয় নির্বাচনে জোট নয়

আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশলও পরিষ্কার করেছেন গোলাম পরওয়ার।

তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে না। ফলে জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় প্রতীকে প্রার্থী দেবে না। তবে দলের স্থানীয় শাখাগুলোকে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই ও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গড়ে ওঠা ১১ দলীয় ঐক্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। স্থানীয় নির্বাচনে জোটের প্রতিটি দল নিজেদের মতো প্রার্থী দিতে পারবে।

ফলে আসন্ন স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি শুরু হলেও নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবিত আইন ও আচরণবিধির বেশ কিছু বিষয় এখনো বিতর্কের মধ্যে রয়েছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থিতা, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতাদের অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক প্রশাসকদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা—এসব প্রশ্নে কমিশন শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা এখন নজরে থাকবে।

spot_img
spot_img

অধিক পঠিত

Related Articles