ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইঝি বৃষ্টি মুখোপাধ্যায় ঘটকের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বীরভূম জেলার রামপুরহাট এলাকার বাড়ি থেকে ২৮ বছর বয়সী বৃষ্টির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, রামপুরহাটের কুশুম্বা গ্রামের পারিবারিক বাড়ির দোতলার একটি ঘর থেকে বিকেলে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ রামপুরহাট সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে পুলিশ আত্মহত্যার সম্ভাবনা বিবেচনা করলেও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
মমতার দূরসম্পর্কের ভাইয়ের মেয়ে বৃষ্টি
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বৃষ্টি মুখোপাধ্যায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দূরসম্পর্কের মামাতো ভাই নীহার মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে। বিয়ের পর তার নাম বৃষ্টি মুখোপাধ্যায় ঘটক হিসেবেও উল্লেখ করা হচ্ছে।
বৃষ্টি বেশ কিছুদিন ধরে রামপুরহাটের কুশুম্বা গ্রামের বাবার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। মঙ্গলবার সেখানেই তার মরদেহ পাওয়া যায়।
পারিবারিক সূত্রের বরাত দিয়ে বাংলা ট্রিবিউন জানিয়েছে, বৃষ্টি কয়েক বছর ধরে বিষণ্নতায় ভুগছিলেন এবং তার চিকিৎসাও চলছিল। ভারতীয় কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, স্বামীর সঙ্গে তার বিবাহবিচ্ছেদের মামলাও চলছিল।
তবে এসব ব্যক্তিগত পরিস্থিতির সঙ্গে তার মৃত্যুর সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করেনি পুলিশ। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
নিয়োগ দুর্নীতি মামলার জেরে হারিয়েছিলেন চাকরি
বৃষ্টির মৃত্যু ঘিরে আলোচনায় এসেছে পশ্চিমবঙ্গের বহুল আলোচিত স্কুল নিয়োগ দুর্নীতি মামলাও।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বৃষ্টি একটি সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ে অশিক্ষক কর্মী হিসেবে চাকরি করতেন। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে কলকাতা হাইকোর্ট বিপুলসংখ্যক শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীর নিয়োগ বাতিলের নির্দেশ দেওয়ার পর তিনিও চাকরি হারান। পরে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও ওই নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।
বৃষ্টির নিয়োগ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। তবে তার বিরুদ্ধে আলাদাভাবে কোনো অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হয়েছিল কি না, প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য নেই।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের একাংশ পারিবারিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, চাকরি হারানোর পর তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তার চিকিৎসাও চলছিল।
কী ছিল পশ্চিমবঙ্গের নিয়োগ কেলেঙ্কারি
পশ্চিমবঙ্গের স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে ২০১৬ সালের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী নিয়োগে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ছিল, যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করে অর্থের বিনিময়ে এবং অন্যান্য অনিয়মের মাধ্যমে বহু ব্যক্তিকে চাকরি দেওয়া হয়েছিল।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর কলকাতা হাইকোর্ট প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীর নিয়োগ বাতিল করে। পরে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়মের কথা উল্লেখ করে মূল সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
এই নিয়োগ কেলেঙ্কারি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে এবং তৎকালীন তৃণমূল সরকারের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়।
বৃষ্টিও ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চাকরি পাওয়া কর্মীদের একজন ছিলেন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
চাকরি হারানো ও ব্যক্তিগত টানাপোড়েন
বৃষ্টির মৃত্যুর পেছনের কারণ অনুসন্ধানে পুলিশ তার সাম্প্রতিক ব্যক্তিগত ও পেশাগত পরিস্থিতিও খতিয়ে দেখছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে।
একদিকে স্কুলের চাকরি হারানো, অন্যদিকে স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা—দুই পরিস্থিতির মধ্যেই তিনি ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবারের দাবি অনুযায়ী, তিনি মানসিক বিষণ্নতার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।
তবে চাকরি হারানো, দাম্পত্য সমস্যা কিংবা মানসিক অবস্থার কোনো একটি বিষয়কে তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে এখনই প্রতিষ্ঠিত করেনি তদন্তকারী সংস্থা।
পুলিশের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বাংলা ট্রিবিউন জানিয়েছে, মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তের ফল পাওয়ার পরই এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
কয়েক দিনের ব্যবধানে রামপুরহাটে আরেক আলোচিত মৃত্যু
বৃষ্টির মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন আগে একই বীরভূমের রামপুরহাটে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক ডেপুটি স্পিকার ও প্রবীণ তৃণমূল নেতা আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে।
বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঁচবারের সাবেক বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় একটি চিরকুট রেখে গিয়েছিলেন। সেখানে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তাকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছিল বলে দাবি করেছিলেন তিনি।
এর কয়েক দিনের মাথায় একই এলাকায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবারের সদস্য বৃষ্টি মুখোপাধ্যায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যু নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো ধরনের যোগসূত্র রয়েছে—এমন তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষা
বৃষ্টির মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ ঘটনাস্থল ঘিরে তদন্ত শুরু করেছে। তার মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল, তিনি কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং কোনো বাহ্যিক কারণ ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পেতে পারে।
এই মুহূর্তে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা আত্মহত্যার দিকে ইঙ্গিত করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুর কারণ ঘোষণা করা হয়নি।
ফলে বৃষ্টি মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু কেন এবং কোন পরিস্থিতিতে হয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখন নির্ভর করছে পুলিশি তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের ওপর।



