হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহে ‘ফোর্স মেজর’ বা অনিবার্য পরিস্থিতির মেয়াদ আরও বাড়িয়েছে কাতার এনার্জি। এর ফলে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশে কাতারি এলএনজির নিয়মিত সরবরাহ কবে স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকটে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলএনজি আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত। বিপরীতে বিভিন্ন উৎস থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এলএনজি কেনায় জাপান তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগটি আরও গভীর। কারণ দেশের এলএনজি আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস কাতার। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট এলএনজি আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ এসেছিল কাতার থেকে। চলতি বছর কাতার এনার্জি থেকে পূর্বনির্ধারিত এলএনজি সরবরাহের প্রায় অর্ধেকই পাওয়া যাবে না বলে ইতিমধ্যে আশঙ্কা করছে রাষ্ট্রায়ত্ত পেট্রোবাংলা।
সেপ্টেম্বরের পরও বাংলাদেশে সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা
কাতার এনার্জির সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাকিস্তানের ক্রেতাদের অক্টোবর পর্যন্ত নির্ধারিত সরবরাহ বাতিল হতে পারে। বাংলাদেশে সরবরাহের ক্ষেত্রেও সেপ্টেম্বরের পর পর্যন্ত বিঘ্ন অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ইউরোপের একাধিক ক্রেতাও একই ধরনের নোটিশ পেয়েছে।
ইতালির জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এডিসন জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত তাদের নির্ধারিত আরও পাঁচটি এলএনজি কার্গো সরবরাহ করতে পারবে না কাতার এনার্জি।
এ নিয়ে এডিসনের ক্ষেত্রে এপ্রিল থেকে বাতিল হওয়া কার্গোর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯টি। এসব চালানে প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস আসার কথা ছিল। এর মধ্যে ২১টি কার্গোর বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানটি।
কিন্তু বাংলাদেশের মতো মূল্যসংবেদনশীল উন্নয়নশীল দেশের জন্য একইভাবে দ্রুত বিকল্প কার্গো কেনা অনেক বেশি কঠিন। কারণ স্পট বা খোলাবাজারে সীমিত এলএনজি কার্গোর জন্য এখন ইউরোপ ও এশিয়ার ক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে।
বাংলাদেশ কেন বেশি ঝুঁকিতে
বাংলাদেশ সাধারণত দুইভাবে এলএনজি আমদানি করে—দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং খোলাবাজার থেকে তাৎক্ষণিক বা স্পট ক্রয়।
কাতার ও ওমানের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি রয়েছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকির কারণে উভয় উৎস থেকেই স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, কাতার এনার্জি থেকে ২০২৬ সালে প্রায় ৪০টি কার্গো পাওয়ার কথা ছিল। যুদ্ধের কারণে এর মধ্যে প্রায় ২০টি কার্গোর সরবরাহ প্রভাবিত হতে পারে।
বাংলাদেশের সঙ্গে কাতারের দুটি দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তি রয়েছে। এর একটি বছরে ২৫ লাখ টন এবং অন্যটি ১৮ লাখ টন সরবরাহের জন্য।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৭০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করেছিল। এর মধ্যে প্রায় ৪১ লাখ ৫০ হাজার টন এসেছিল কাতার থেকে। অর্থাৎ দেশের আমদানি করা এলএনজির অর্ধেকের অনেক বেশিই সরবরাহ করেছিল কাতার।
ফলে কাতারের সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও সার উৎপাদনসহ পুরো গ্যাসনির্ভর অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াতে পারে।
দরপত্র দিয়েও এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না
ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক খোলাবাজার থেকে অতিরিক্ত এলএনজি কেনার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। কিন্তু সেখানেও সমস্যা দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি পেট্রোবাংলা এলএনজি কিনতে দরপত্র আহ্বান করেও প্রয়োজনীয় কার্গো পায়নি। সেপ্টেম্বরের জন্য আরও কার্গো সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি সম্ভাব্য সব উৎস থেকে এলএনজি আনার চেষ্টা চলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পাশাপাশি সামনে ইউরোপের শীতকাল থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির চাহিদাও বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশকে শুধু কার্গো পাওয়ার জন্য নয়, দাম নিয়েও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
ছয় মাসে কাতারের ৫০৯ কার্গো নেমে এসেছে ১৮টিতে
হরমুজ সংকট কাতারের এলএনজি রপ্তানিতে কতটা বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, তা রপ্তানি পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট।
যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজি কার্গো রপ্তানি করতে পেরেছে। আগের বছরের একই সময়ে দেশটি রপ্তানি করেছিল ৫০৯টি কার্গো।
অর্থাৎ কাতারের এলএনজি রপ্তানি প্রায় ৯৬ শতাংশ কমেছে। এর ফলে গ্যাস বিক্রি থেকে দেশটির আনুমানিক ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের রাজস্ব হারিয়েছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশই আসত কাতার থেকে।
এত বড় একটি সরবরাহকারী কার্যত বাজার থেকে ছিটকে যাওয়ায় তার প্রভাব এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি বাজারেও ছড়িয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাড়াচ্ছে সরবরাহ, তবু ঘাটতি কাটছে না
কাতারের সরবরাহ কমে যাওয়ার সুযোগে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য এলএনজি উৎপাদক দেশগুলো রপ্তানি বাড়িয়েছে।
কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির বিশেষজ্ঞ অ্যান-সোফি করবোর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে সরবরাহ বেড়েছে। গত এক বছরে নতুন যেসব এলএনজি প্রকল্প উৎপাদনে এসেছে, সেগুলোও বাজারে অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করছে।
নাইজেরিয়া ও মালয়েশিয়াও উৎপাদন বাড়িয়েছে। কিন্তু এসব অতিরিক্ত সরবরাহ দিয়েও কাতারের অনুপস্থিতির পুরো ঘাটতি পূরণ করা যাচ্ছে না।
এ কারণে বাজারে যে কার্গোগুলো পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর বড় অংশ যাচ্ছে বেশি দাম দিতে সক্ষম ক্রেতাদের কাছে।
কিছু এশীয় দেশ এলএনজির ব্যবহার কমিয়েছে বা বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকেছে। ইউরোপও সব ক্ষেত্রে উচ্চমূল্যের স্পট এলএনজির জন্য প্রতিযোগিতা না করে নিজেদের মজুত করা গ্যাস বেশি ব্যবহার করছে।
পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারত সবচেয়ে ঝুঁকিতে
সব এলএনজি আমদানিকারক দেশের ঝুঁকি সমান নয়।
যেসব দেশের মোট জ্বালানি সরবরাহে এলএনজির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ এবং আমদানির বড় অংশ কাতার বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য পরিস্থিতি বেশি কঠিন।
অ্যান-সোফি করবোর মূল্যায়নে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারত।
বিশেষ করে যেসব ক্রেতার পর্যাপ্ত বিকল্প দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নেই এবং স্পট মার্কেটের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়, তারা মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকিতে বেশি রয়েছে।
অন্যদিকে জাপান তুলনামূলক নিরাপদ। কারণ দেশটি কাতারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল নয় এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উৎসের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি রয়েছে।
হরমুজ এত গুরুত্বপূর্ণ কেন
পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে সরু হরমুজ প্রণালি। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ এটি।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। একই সঙ্গে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেলপ্রবাহের সঙ্গেও এই জলপথের সম্পর্ক রয়েছে।
কাতারের জন্য সমস্যাটি আরও গুরুতর। দেশটির বিপুল এলএনজি উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বড় আকারে এলএনজি রপ্তানির কার্যকর বিকল্প পথ নেই।
কিছু তেলবাহী জাহাজ এখন প্রণালি ব্যবহার করলেও এলএনজি ট্যাংকারের চলাচল অত্যন্ত সীমিত। এলএনজি পরিবহনে বিশেষায়িত জাহাজ প্রয়োজন হওয়ায় দ্রুত বিকল্প জাহাজ সংগ্রহ করাও সহজ নয়।
হরমুজ খুললেও সঙ্গে সঙ্গে ফিরবে না স্বাভাবিক সরবরাহ
হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল পুরোপুরি শুরু হলেও কাতারের এলএনজি রপ্তানি তাৎক্ষণিকভাবে আগের অবস্থায় ফিরবে না।
কাতার এনার্জির ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া ১২টি এলএনজি উৎপাদন ইউনিট পুরোপুরি পুনরায় চালু করতে প্রায় দুই মাস সময় লাগতে পারে।
আর রাস লাফান এলাকায় হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত দুটি উৎপাদন ইউনিট মেরামতে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে কাতার এনার্জি।
জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর সীমিত পরিসরে এলএনজি পরিবহন আবার শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী হামলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিতে সেই অগ্রগতি স্থায়ী হয়নি।
২০২৮ সালের আগে বাজার স্বাভাবিক নাও হতে পারে
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নাইজেরিয়ায় নতুন এলএনজি রপ্তানি অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে। এসব প্রকল্প চালু হলে আগামী কয়েক বছরে কাতারের বাইরে থেকে বৈশ্বিক সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নতুন সক্ষমতা পুরোপুরি বাজারে আসা এবং সরবরাহ-চাহিদার ভারসাম্য আগের মতো স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে ফিরতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এর অর্থ, বর্তমান সংকট দ্রুত সমাধান না হলে বাংলাদেশের সামনে শুধু কয়েক মাসের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়, বরং মধ্যমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জও তৈরি হতে পারে।
কাতারের কার্গো না পাওয়া, স্পট মার্কেটে উচ্চমূল্য, ইউরোপের শীতকালীন চাহিদা এবং বিকল্প সরবরাহের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জন্য আগামী কয়েক মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পেট্রোবাংলাকে একদিকে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে বেশি দামে এলএনজি আমদানির কারণে সরকারের জ্বালানি ব্যয় ও ভর্তুকির ওপর সম্ভাব্য বাড়তি চাপও সামলাতে হবে।
কাতারের সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তাই বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভর করবে—বিকল্প উৎস থেকে কত দ্রুত এবং কোন দামে এলএনজি কার্গো নিশ্চিত করা যায় তার ওপর।



