হামে শিশুমৃত্যু: ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের রুল

টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহে গাফিলতির অভিযোগ; সাত মাসের সাফওয়ানের মৃত্যুতে স্বাধীন তদন্তও চাওয়া হয়েছে রিটে

হামে আক্রান্ত হয়ে সাত মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে কেন এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ছয় বিবাদীকে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন।

আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. জুয়েল আজাদ। তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী আবিদা আসমা প্রমি।

রিটে ড. ইউনূস ছাড়াও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ঢাকা জেলা প্রশাসককে বিবাদী করা হয়েছে।

সাত মাসের সাফওয়ানের মৃত্যু

মামলার নথি অনুযায়ী, গত ২৬ মে রাজধানীর শ্যামলীর বেবি কেয়ার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে সাত মাস বয়সী সাফওয়ান ইসলাম জাহিন মারা যায়। সে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের ক্লার্ক মো. শাকিলের ছেলে।

ছেলের মৃত্যুর পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলার অভিযোগ তুলে শাকিলের পক্ষে গত ৫ জুলাই হাইকোর্টে রিট করেন আইনজীবী মো. জুয়েল আজাদ। পরদিন ৬ জুলাই রিট দায়েরের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

আবেদনে সাফওয়ানের পরিবারকে অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ হিসেবে জরুরি ভিত্তিতে পাঁচ লাখ টাকা এবং রিটের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পর এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়।

একই সঙ্গে হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশুটির মৃত্যুর ক্ষেত্রে কোনো প্রশাসনিক অবহেলা বা গাফিলতি ছিল কি না, তা অনুসন্ধানে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।

টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহে গাফিলতির অভিযোগ

রিটের গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে হাম প্রতিরোধী টিকা সংগ্রহ, মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ।

রিট আবেদনকারীর দাবি, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা সংগ্রহের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছিল। ওই সময়ে টিকার মজুত ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহে কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

এ কারণে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে টিকা সংগ্রহ ও মজুতসংক্রান্ত যাবতীয় নথি আদালতে দাখিলের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।

রিটকারী পক্ষের আইনজীবী জুয়েল আজাদের বক্তব্য, যথাযথ চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে শিশুটির সংক্রমণ ও মৃত্যু এড়ানো যেত বলে তার বাবা বিশ্বাস করেন।

ড. ইউনূসকে কেন বিবাদী করা হয়েছে, সে বিষয়ে আইনজীবীর বক্তব্য হচ্ছে, যে সময়ের টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অবহেলার অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেই সময়ে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।

তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। মঙ্গলবারের রুলও কোনো বিবাদীর দায় নির্ধারণ বা এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চূড়ান্ত নির্দেশ নয়। রুলের মাধ্যমে আদালত বিবাদীদের কাছে জানতে চেয়েছেন, কেন ওই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে না।

ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই শিশুটির মৃত্যু

সাফওয়ানের মৃত্যু ঘটে এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হয়েছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স গত ২৩ মে জানায়, ১৫ মার্চ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত দেশে ৬২ হাজার ৫০৭টি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত সংক্রমণ ছিল ৮ হাজার ৪৯৪টি। ওই সময় পর্যন্ত নিশ্চিত হামে অন্তত ৮৬ শিশুর মৃত্যু এবং হামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উপসর্গ থাকা আরও ৪২৬ জনের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়েছিল।

সাফওয়ানের মৃত্যু হয় এর তিন দিন পর, ২৬ মে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সে সময় বাংলাদেশে নিয়মিত টিকাদানের হার কমে যাওয়াকে বড় আকারের হাম প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করেছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঁচ বছরের কম বয়সী এবং বিশেষ করে টিকা না পাওয়া বা প্রয়োজনীয় সব ডোজ না পাওয়া শিশুরা গুরুতর সংক্রমণ ও মৃত্যুর বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

এরও আগে এপ্রিলে সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও গ্যাভির সহযোগিতায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। প্রথম পর্যায়ে উচ্চঝুঁকিতে থাকা ১৮ জেলার ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের লক্ষ্য করে কর্মসূচি নেওয়া হয়। পরে পর্যায়ক্রমে তা দেশব্যাপী সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

এর আগেও হাইকোর্টে উঠেছে হামে শিশুমৃত্যুর প্রশ্ন

দেশজুড়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় এর আগেও হাইকোর্টে একাধিক রিট হয়েছে।

গত ১০ মে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ৩৫২ শিশুর প্রত্যেক পরিবারকে দুই কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে জনস্বার্থে একটি রিট করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার হুমায়ন কবির পল্লব। ওই আবেদনে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।

১৯ মে পৃথক দুটি রিটের শুনানিতে বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর একই হাইকোর্ট বেঞ্চ জানতে চান, হামে মারা যাওয়া শিশুদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ এবং প্রাদুর্ভাবের কারণ তদন্তে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না। পাশাপাশি হামসহ শিশুস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রশ্নেও রুল দেওয়া হয়। সরকার এ পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সে সম্পর্কেও তথ্য দিতে বলা হয়েছিল।

ফলে সাফওয়ানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবারের রুলটি এমন একটি সময়ে এলো, যখন হাম মোকাবিলায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব, টিকার পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুমৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন ইতোমধ্যেই উচ্চ আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে।

ফৌজদারি মামলার আবেদন থেকে এই রিট আলাদা

হামে শিশুমৃত্যু নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ড. ইউনূস ও সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমসহ সাবেক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার আবেদনও হয়েছিল। তবে সেগুলো মঙ্গলবারের হাইকোর্টের রিট থেকে পৃথক আইনি প্রক্রিয়া।

গত জুলাইয়ে নয় মাস বয়সী সওদা নুসকানের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা সিরাজুল ইসলাম ড. ইউনূস, সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ডা. মো. আবু জাফর এবং সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়ার আবেদন করেছিলেন। ১২ জুলাই ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জাশিতা ইসলাম মামলাটি গ্রহণের পর্যাপ্ত ভিত্তি নেই উল্লেখ করে আবেদনটি খারিজ করেন।

এর আগে জুনেও হামে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় ড. ইউনূসসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়ার আরেকটি আবেদন প্রমাণের পর্যাপ্ত ভিত্তি না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে খারিজ করেছিলেন একই আদালত।

অন্যদিকে সাফওয়ান ইসলাম জাহিনের পরিবারের বর্তমান আবেদনটি ফৌজদারি মামলা নয়; এটি হাইকোর্টে করা রিট। এতে মূলত ক্ষতিপূরণ, টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহে কথিত অবহেলার স্বাধীন তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র আদালতে উপস্থাপনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।

চার সপ্তাহের মধ্যে বিবাদীদের জবাব পাওয়ার পর রুলের পরবর্তী শুনানিতে আদালত ক্ষতিপূরণ ও রিটে তোলা অন্যান্য দাবির বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত দেবেন।

spot_img
spot_img

অধিক পঠিত

Related Articles