সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে সদ্য গঠিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান নিয়ে চলমান আলোচনার মধ্যে প্রথমবারের মতো এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারত। নয়াদিল্লি বলেছে, পশ্চিম এশিয়ার পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং ভারতের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিষয়টি ওঠে আসে।
এক সাংবাদিক জানতে চান, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের নতুন সামরিক জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের বিষয়টি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা এবং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, নয়াদিল্লি পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তবে এ পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
একই সঙ্গে জয়সওয়াল বলেন, ভারত তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।
৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত হয় ‘মক্কা চুক্তি’
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এতে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার নীতি। তিন সদস্যরাষ্ট্রের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা এতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদারের কথা রয়েছে।
এই বৈশিষ্ট্যের কারণে চুক্তিটির সঙ্গে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতির তুলনা করা হচ্ছে। তবে চুক্তির অধীনে কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য দেশগুলো ঠিক কী ধরনের এবং কতটা সামরিক সহায়তা দিতে বাধ্য থাকবে, তার সব কার্যকরী দিক এখনো প্রকাশ্যে স্পষ্ট নয়।
পাকিস্তান বলেছে, নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক’ এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়। ইসলামাবাদ আরও জানিয়েছে, চুক্তির নীতিগুলো মেনে চলতে আগ্রহী অন্য দেশের জন্যও এতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তুরস্কও জোটটির পরিধি ভবিষ্যতে বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী এই ব্যবস্থা শুধু তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আরও সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
বাংলাদেশকে ঘিরে আলোচনা
বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। ফলে বাংলাদেশের যোগদান নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা এখনো সম্ভাবনা ও কূটনৈতিক জল্পনার পর্যায়েই রয়েছে।
তবে পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ঢাকা ভবিষ্যতে কোনো নতুন বহুপক্ষীয় ব্যবস্থায় যুক্ত হবে কি না, সে প্রশ্ন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে চুক্তির অন্যতম সদস্য পাকিস্তান হওয়ায় ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বাড়তি গুরুত্ব বহন করছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তিত গতিপ্রকৃতিও ভারতীয় কৌশলগত মহলে পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে মক্কা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোয় নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। কারণ এতে একদিকে ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক, অন্যদিকে পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি সৌদি আরব একই প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হয়েছে।
তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়েও প্রশ্ন
একই ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর এবং ব্রিকস সম্মেলনে তার অংশগ্রহণের বিষয়েও রণধীর জয়সওয়ালের কাছে জানতে চাওয়া হয়।
জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে আপাতত তার কাছে জানানোর মতো কোনো তথ্য নেই। নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তা জানানো হবে।
তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন খবর প্রকাশিত হলেও ঢাকা এখনো সফরের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেনি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ এ এম সালেহও জানিয়েছেন, সফরের বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
গঙ্গা পানি চুক্তিও আলোচনায়
সংবাদ ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ-ভারতের ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
জবাবে জয়সওয়াল স্মরণ করিয়ে দেন, চুক্তিটির মেয়াদ ৩০ বছর। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নদীসংক্রান্ত বিষয়গুলো যৌথ নদী কমিশনের আওতায় আলোচনা হয় এবং গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির অধীন যৌথ কমিটিও কারিগরি পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠক করছে।
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। ফলে চুক্তির নবায়ন বা নতুন কোনো কাঠামো তৈরির প্রশ্ন এখন ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
এর মধ্যেই ভারতের বিহার রাজ্যের রাজনৈতিক নেতাদের একটি অংশ বর্তমান শর্তে চুক্তি নবায়নের বিরোধিতা করছেন। ফলে গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নতুন আঞ্চলিক সমীকরণ
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির ঘোষিত উদ্দেশ্য হচ্ছে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত নিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখা। পাকিস্তান ও তুরস্ক উভয়েই জোর দিয়ে বলেছে, এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে গঠিত সামরিক ব্যবস্থা নয়।
তবে বাংলাদেশ এতে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না নিলেও সম্ভাবনাটি নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে প্রশ্ন ওঠা ইঙ্গিত দেয়, বিষয়টি নয়াদিল্লির নজরেও রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া—পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার কথা বলা—দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।




