ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ না করেই ফিরে গেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ-বিজয়নগর আংশিক) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। এ সময় তার আনা পুষ্পস্তবক ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ ওঠে প্রতিপক্ষের কর্মীদের বিরুদ্ধে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে গভীর রাতে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করেন তার সমর্থকেরা।
শুক্রবার দিবাগত রাত প্রায় ১২টার দিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও মহান শহীদ দিবস উপলক্ষে সরাইল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে যান রুমিন ফারহানা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত পৌনে ১২টার দিকে তিনি পুষ্পস্তবক নিয়ে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে পৌঁছান। এ সময় তার কর্মী-সমর্থকেরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সরাইল উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মাস্টারের নেতৃত্বে একদল বিএনপি নেতাকর্মী সেখানে এসে রুমিন ফারহানাকে উদ্দেশ করে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকেন। পাল্টা স্লোগান শুরু হলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়।
রুমিন ফারহানার অভিযোগ, প্রতিপক্ষের কর্মীরা তার আনা পুষ্পস্তবক ছিঁড়ে ফেলেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও উত্তেজনার কারণে তিনি আর ফুল দিতে পারেননি। পরে কর্মী-সমর্থকদের পাহারায় তিনি শহীদ মিনার এলাকা ত্যাগ করেন।
ঘটনার পর রাত সাড়ে ১২টার দিকে শাহবাজপুর এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে অবস্থান নেন রুমিন ফারহানার সমর্থকেরা। তারা সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে এবং বাঁশে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করেন। এতে মহাসড়কে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে হাইওয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে অবরোধ সরিয়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
ঘটনার পর নিজ বাসভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী আমি প্রথমে শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাই। সে সময় বিএনপির কতিপয় নেতাকর্মী পরিকল্পিতভাবে আমার ওপর হামলার চেষ্টা করেছে।” তিনি বলেন, “দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে। এখন যদি মাঠপর্যায়ে তাদের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তার পরিণাম ভয়াবহ হবে।”
তিনি আরও বলেন, “যারা দলের পদ ব্যবহার করে এ ধরনের হিংস্রতা করে, তাদের বিরুদ্ধে দলের উচ্চপর্যায় থেকে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। না হলে দলের যেমন ক্ষতি হবে, সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হবে।” এ সময় তিনি জানান, তার কর্মী আব্দুল আহাদ আহত হয়েছেন এবং এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে সরাইল উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মাস্টার বলেন, “রুমিন ফারহানা শহীদ মিনারে আসার সময় ৫০-৬০টি মোটরসাইকেল নিয়ে এবং ঢাকা থেকে সশস্ত্র ক্যাডার এনে উসকানিমূলক স্লোগান দিয়ে এলাকায় প্রবেশ করেন।” তিনি দাবি করেন, “বিএনপির নেতাকর্মীরা নয়, তার উচ্ছৃঙ্খল কর্মী-সমর্থকরাই শহীদ বেদীতে সেলফি তুলতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কিতে লিপ্ত হয়।”
ঘটনাস্থলে উপস্থিত সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু বকর সরকার বলেন, “উনি (রুমিন ফারহানা) এসেছিলেন, আমরাও ছিলাম। দুপক্ষের মধ্যে স্লোগান পাল্টা স্লোগান হয়েছে। ওসিও উপস্থিত ছিলেন। আমরা পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছি।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শাহ মোহাম্মদ আব্দুর রউফ জানান, “শহীদ মিনারে দুই পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও স্লোগান দেওয়ার বিষয়ে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুরো বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। পরে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে সম্ভাব্য অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এই ঘটনায় সরাইলসহ আশপাশের এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভাষা শহীদদের স্মৃতির মতো জাতীয় আবেগের অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হওয়া উদ্বেগজনক এবং এটি স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে বিভাজনের ইঙ্গিত বহন করতে পারে।