ছাত্ররাজনীতি থেকে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি থেকে তৃণমূলের রাজনীতি, পৌরসভার চেয়ারম্যান থেকে সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী—এরপর দীর্ঘদিন দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির মহাসচিব। পাঁচ দশকের বেশি সময়ের এই রাজনৈতিক ও পেশাগত পথ পেরিয়ে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। প্রায় ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থীর মধ্যে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।
রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিক। তিনি পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ছিলেন এবং পরে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদেও দায়িত্ব পালন করেন। মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।
রাজনীতির সঙ্গে মির্জা ফখরুলের পারিবারিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত। তার চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট রাজনীতিক। তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষে মির্জা ফখরুল ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
বামপন্থী ছাত্ররাজনীতি দিয়ে শুরু
জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে উঠলেও মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। সংগঠনটির এস এম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ওই সময় রাজনৈতিক কারণে তাকে কারাবরণও করতে হয়েছিল।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করেই তিনি সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে প্রবেশ করেননি। তার পেশাগত জীবনের শুরু হয়েছিল শিক্ষক হিসেবে।
ঢাকা কলেজে অর্থনীতির শিক্ষক
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মির্জা ফখরুল। পরে আরও কয়েকটি সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন।
শিক্ষকতার পাশাপাশি সরকারি দায়িত্বেও কাজ করেছেন তিনি। সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপপরিচালক এবং বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও দায়িত্ব পালন করেন।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল।
শেষ পর্যন্ত ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তিনি। দুই বছর পর ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
তৃণমূল থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে
সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিতে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। ১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়।
এরপর ধীরে ধীরে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন তিনি। বিএনপির কৃষক সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের নেতৃত্বেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে বিএনপির নির্বাহী কমিটিতে জায়গা করে নেন।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হন। ২০১১ সালে খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রায় পাঁচ বছর সেই দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের মহাসচিব হন।
বিরোধী রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ
বিএনপির নেতৃত্বে মির্জা ফখরুলের উত্থান এমন এক সময়ে, যখন দলটি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে ছিল। খালেদা জিয়ার কারাবাস ও অসুস্থতা এবং তারেক রহমানের লন্ডনে অবস্থানের সময় দেশের ভেতরে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দৃশ্যমান প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।
শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সামনের সারিতে ছিলেন মির্জা ফখরুল। এই সময়ে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণের মুখোমুখি হন তিনি।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হলেও নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি তিনি।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পান তিনি।
যেভাবে এলো রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়। পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেন।
ক্ষমতাসীন বিএনপি ১৩ আগস্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তার নাম প্রস্তাব করলে তা সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়।
রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর বিএনপির মহাসচিব এবং দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে সরে দাঁড়ান মির্জা ফখরুল।
শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার সংসদ সদস্যদের ভোটে অলি আহমদকে ২৫৫-৮৮ ভোটে পরাজিত করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৯১ সালের পর এটিই ছিল বাংলাদেশের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
দলীয় রাজনীতি ছেড়ে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ দলীয় রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। এতদিন বিএনপির নীতিনির্ধারণ ও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে পরিচিত এই রাজনীতিক এখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধানের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির পদ মূলত সাংবিধানিক। সরকারের দৈনন্দিন নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে থাকলেও রাষ্ট্রপতি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। সাংবিধানিকভাবে তার আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।
শুক্রবার, ২১ আগস্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বামপন্থী ছাত্রনেতা, অর্থনীতির শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, পৌরসভার চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং বিএনপির দীর্ঘদিনের মহাসচিব হিসেবে অতিক্রম করা তার পাঁচ দশকের বেশি সময়ের রাজনৈতিক ও পেশাগত যাত্রায় যুক্ত হচ্ছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ।