টি–২০ বিশ্বকাপ ২০২৬ না খেলার সিদ্ধান্তকে ক্রিকেটারদের ওপর “মানসিক নির্যাতনের শামিল” বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মহম্মদ সালাউদ্দিন। এই সিদ্ধান্তের জেরে অন্তত দু’জন জাতীয় দলের ক্রিকেটার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন এবং কয়েক দিন কার্যত মানসিক কোমার মতো অবস্থায় ছিলেন বলেও বিস্ফোরক দাবি করেছেন তিনি।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল-কে সরাসরি দায়ী করে সালাউদ্দিন অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কিংবা ক্রিকেটারদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনায় না গিয়েই বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার ভাষায়, এই সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ একতরফা এবং খেলোয়াড়দের স্বপ্নকে নির্মমভাবে ধ্বংস করার নামান্তর।
সালাউদ্দিন বলেন, “একটা ছেলে হয়তো ২৫–২৭ বছর ধরে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য দিনের পর দিন কষ্ট করে। আর একজন মানুষ এক সেকেন্ডে এসে তার সেই স্বপ্ন ভেঙে দিল। এটা মানসিক নির্যাতন ছাড়া আর কী?”
তিনি জানান, এই সিদ্ধান্তে ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত ও মানসিক ক্ষতি হয়েছে। যদি রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো, তাহলে হয়তো সেই ত্যাগ মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু তার দাবি, এটি ছিল একটি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যার বোঝা বইতে হয়েছে খেলোয়াড়দের।
সালাউদ্দিন বলেন, “দলের অন্তত দু’জন ক্রিকেটার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। কোচ হিসেবে আমি জানি, প্রায় পাঁচ দিন তারা মানসিক কোমার মধ্যে ছিল। নিজেরা নিজেদের সামলাতে পারছিল না।”
প্রাক্তন ক্রীড়া উপদেষ্টার বক্তব্যের ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জাতীয় দলের এই কোচ। তার অভিযোগ, আসিফ নজরুল বিশ্বকাপ বয়কটের বিষয়ে প্রকাশ্যে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। শুরুতে তিনি সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন, বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত সরকারের। কিন্তু পরে তিনি দাবি করেন, ক্রিকেট বোর্ড ও ক্রিকেটারদের সঙ্গে আলোচনা করেই সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সালাউদ্দিন বলেন, “আমি জানি না, একজন শিক্ষক কীভাবে প্রকাশ্যে এত ডাহা মিথ্যে কথা বলতে পারেন। উনি একসময় এক কথা বলেছেন, পরে সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলেছেন। এই মিথ্যাচার আমার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।”
সালাউদ্দিনের দাবি অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত যে বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে, তা বোর্ড কর্তারা ভালোভাবেই জানতেন। জাতীয় দলের সিনিয়র ক্রিকেটার লিটন দাস, নাজমুল হোসেন শান্তদের সঙ্গে যে বড় অন্যায় হচ্ছে, সেটাও অজানা ছিল না। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে—এটা বিসিবির শীর্ষ কর্মকর্তারাও বুঝতেন। কিন্তু সরকারের চাপের কাছে তারা অসহায় ছিলেন।”
তার মতে, বিশ্বকাপ বর্জনের ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে না খেললে অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি—সবকিছুতেই ঘাটতি তৈরি হয়।
সালাউদ্দিনের এই প্রকাশ্য ক্ষোভ বাংলাদেশ ক্রিকেটে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে। সাবেক ক্রিকেটার, বিশ্লেষক এবং সমর্থকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, জাতীয় দলের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ক্রিকেটের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপ বয়কটের সিদ্ধান্ত শুধু একটি টুর্নামেন্টে না যাওয়ার বিষয় ছিল না; এটি ছিল হাজারো ক্রিকেটারের স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। সালাউদ্দিনের বক্তব্য সেই ক্ষোভ ও হতাশাকেই প্রকাশ্যে সামনে এনে দিয়েছে।
এই বিতর্কের মধ্য দিয়ে আবারও উঠে এসেছে—জাতীয় স্বার্থের নামে ক্রীড়াঙ্গনে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসংগত, এবং সেই সিদ্ধান্তের দায় শেষ পর্যন্ত কারা বহন করবে।