একুশের চেতনায় দুর্নীতি ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আহ্বান টিআইবির

Date:

Share post:

অমর একুশের চেতনা প্রতিষ্ঠা ছাড়া “নতুন বাংলাদেশ” গড়া সম্ভব নয়—এমন মন্তব্য করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, দুর্নীতি ও ধর্মান্ধতাকে প্রতিহত করাই একুশের মূল শিক্ষা। তার মতে, ভাষা আন্দোলনের চেতনা ছিল বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই, যেখানে সব মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করাই ছিল মূল লক্ষ্য।

শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকালে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “দুর্নীতি একুশের চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। একুশ আমাদের শিখিয়েছে—বাংলাদেশের সব মানুষের সমান অধিকার থাকতে হবে। বিশেষ করে নারী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, আদিবাসী, প্রতিবন্ধীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করাই একুশের চেতনার মূল বিষয়।”

তিনি আরও বলেন, সমাজে যেসব শক্তি মানুষের সমান অধিকারকে অস্বীকার করে বা খর্ব করে, তাদের বিরুদ্ধেই একুশের চেতনার অবস্থান। “যে শক্তি মানুষের মৌলিক অধিকার—সমান মর্যাদা ও নিরাপদ জীবনযাপনের পথে বাধা সৃষ্টি করে, তাকে প্রতিহত করতেই হবে,” বলেন তিনি।

টিআইবির নাম বাংলায় না রাখার বিষয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, টিআইবি একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং এই নামেই এটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তবে ভাষা আন্দোলনের চেতনার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “ভাষা আন্দোলন মানে শুধু বাংলা ভাষার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নয়। এর অর্থ কখনোই অন্য ভাষাকে বর্জন করা বা অবমূল্যায়ন করা ছিল না। আমাদের শহীদদের চেতনায় অন্য ভাষার প্রতি অসম্মান ছিল না।”

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বাংলাদেশে বাংলার পাশাপাশি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা রয়েছে, যেগুলোর চর্চা ও সংরক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। “আমাদের দেশ বহুভাষিক বাস্তবতার মধ্যেই গড়ে উঠেছে,” বলেন তিনি।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, “আজ আমরা যখন ভাষার অধিকারের কথা বলি, তখন প্রশ্ন আসে—কেন তা শুধু বাংলা ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ শব্দবন্ধটির অর্থই হলো, প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব মাতৃভাষা চর্চার সমান অধিকার নিশ্চিত করা।”

তিনি বলেন, একুশের চেতনা আসলে বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের আহ্বান। “সব মানুষের সমান অধিকার এবং নির্বিঘ্নে ভাষা চর্চার পথে যেসব অন্তরায় রয়েছে, সেগুলো আমাদের স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে,” বলেন তিনি।

ড. ইফতেখারুজ্জামান যোগ করেন, “এই অন্তরায়গুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো দুর্নীতি ও ধর্মান্ধতা। এই দুই শক্তি সমাজে বৈষম্য তৈরি করে, মানুষে মানুষে বিভাজন সৃষ্টি করে এবং ভাষা আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।”

তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে—একুশের চেতনা শুধু অতীত স্মরণের বিষয় নয়, বরং বর্তমান রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার নৈতিক দিকনির্দেশনা। দুর্নীতি ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে লড়াই এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার মধ্য দিয়েই সেই চেতনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

ভাষা শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামানের এই বক্তব্য সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং সুশাসনের প্রশ্নে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

spot_img

Related articles

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রবীণ নেতা ও সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রায় ৩৫ বছর...

ইসলাম গ্রহণের খবর অস্বীকার করলেন রবার্তো কার্লোস

ইসলাম ধর্ম গ্রহণের খবর অস্বীকার করেছেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার রবার্তো কার্লোস। মরক্কোর ফুটবল এজেন্ট সোহাইলা এল তাহিরিকে বিয়ের...

সাংবাদিক দেবাশীষসহ চার স্বজনের মরদেহ শনিবার দেশে আসতে পারে

কলকাতার একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ তার পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ শনিবার দেশে আনা...

মির্জা ফখরুল: শিক্ষকতা থেকে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি

ছাত্ররাজনীতি থেকে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি থেকে তৃণমূলের রাজনীতি, পৌরসভার চেয়ারম্যান থেকে সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী—এরপর দীর্ঘদিন দেশের অন্যতম...