১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল কেবল একটি দিনের ঘটনা নয়, ছিল রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরস্ত্র শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বীকৃতির দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন। পুলিশের গুলিতে আবুল বরকত, আব্দুস সালাম, রফিক, শফিক ও আব্দুল জব্বারসহ অনেকেই শহীদ হন। সেই রক্তাক্ত দিনের মধ্য দিয়েই ভাষা একটি সাংবিধানিক দাবির গণ্ডি ছাড়িয়ে আত্মপরিচয়, মর্যাদা ও অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়।
বায়ান্নর এই অভিজ্ঞতা শুধু বাংলাদেশের নয়। পরবর্তী দশকগুলোতে বিশ্বের নানা দেশে ভাষার প্রশ্ন রাষ্ট্রীয় সংকট, সংঘাত এমনকি রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের কারণ হয়ে উঠেছে। ভাষা কোথাও জাতিগত বিভাজনের কেন্দ্র, কোথাও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্ন, আবার কোথাও স্বাধীনতার আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছে।
শ্রীলংকা: রাষ্ট্রভাষা নীতি থেকে গৃহযুদ্ধের পথে
১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর শ্রীলংকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সিনহালা জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসে। ১৯৫৬ সালে এস ডব্লিউ আর ডি বান্দারানায়েকের সরকার ‘সিনহালা অনলি অ্যাক্ট’ পাস করে সিনহালাকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করে। এতে প্রায় ২০ শতাংশ তামিল জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, শিক্ষা ও চাকরি থেকে কার্যত বাদ পড়ে।
তামিলদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের জবাবে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৫৮ সালের দাঙ্গায় শত শত মানুষ নিহত হন। ভাষা প্রশ্নই ধীরে ধীরে শ্রীলংকাকে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। অবশেষে ১৯৮৭ সালের ইন্দো–লংকা চুক্তির মাধ্যমে তামিল ভাষা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়, তবে তত দিনে দেশটি গভীর ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছিল।
ভারত: হিন্দি আধিপত্যের বিরুদ্ধে তামিল প্রতিরোধ
ভারতের সংবিধান ১৯৫০ সালে হিন্দিকে কেন্দ্রীয় সরকারি ভাষা হিসেবে নির্ধারণ করে এবং ১৯৬৫ সালের মধ্যে ইংরেজির ব্যবহার বন্ধ করার পরিকল্পনা নেয়। এই সিদ্ধান্ত দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।
১৯৬৫ সালে তামিলনাড়ু জুড়ে সহিংস আন্দোলন শুরু হয়। আত্মদাহ, পুলিশি সংঘর্ষ ও দাঙ্গায় অন্তত ৬০–৭০ জন নিহত হন। ভাষার প্রশ্ন সেখানে রাজনৈতিক বিপ্লবে রূপ নেয়। ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের পতন ঘটে এবং দ্রাবিড় রাজনীতি শক্তিশালী হয়। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্র সরকার বাধ্য হয়ে হিন্দির পাশাপাশি ইংরেজির অনির্দিষ্টকালীন ব্যবহার নিশ্চিত করে।
বেলজিয়াম: ভাষা বিভাজন থেকে ফেডারেল রাষ্ট্র
বেলজিয়ামে দীর্ঘদিন ফরাসি ভাষা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতীক ছিল, যদিও দেশের বড় অংশ ফ্লেমিশ (ডাচ) ভাষাভাষী। ১৯৬০-এর দশকে ভাষা সংকট চরমে পৌঁছায়।
১৯৬২–৬৩ সালে ভাষাভিত্তিক আইন প্রণয়ন করে দেশকে চারটি ভাষা অঞ্চলে ভাগ করা হয়। ১৯৬৮ সালে লুভেন বিশ্ববিদ্যালয় সংকট দেশকে নাড়িয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৭০ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিক সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে বেলজিয়াম একক রাষ্ট্র থেকে ভাষাভিত্তিক ফেডারেল রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়।
স্পেন: দমন থেকে স্বায়ত্তশাসনের পথে কাতালান ভাষা
ফ্রাঙ্কো শাসনামলে (১৯৩৯–১৯৭৫) স্পেনে কাতালান, বাস্ক ও গ্যালিসিয়ান ভাষা কঠোরভাবে দমন করা হয়। গণতন্ত্রে উত্তরণের পর ১৯৭৮ সালের সংবিধান আঞ্চলিক ভাষাকে স্বীকৃতি দেয়।
কাতালান ভাষা শিক্ষা, প্রশাসন ও সংস্কৃতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ২০১০ সালের পর কাতালান স্বায়ত্তশাসন সীমিত করার উদ্যোগ ভাষাকে আবার রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। কাতালান স্বাধীনতা আন্দোলনে ভাষা হয়ে ওঠে পরিচয় ও রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতীক।
পাকিস্তান: বাংলাদেশ স্বাধীনতার পরও ভাষা সংকট
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তান ভাষা প্রশ্নে আত্মসমীক্ষার মুখোমুখি হয়। ১৯৭২ সালে সিন্ধ প্রদেশে সিন্ধি ভাষাকে প্রাদেশিক ভাষা করার সিদ্ধান্তের পর করাচি ও হায়দ্রাবাদে ভয়াবহ দাঙ্গা শুরু হয়।
উর্দুভাষী ও সিন্ধিভাষীদের সংঘর্ষে অন্তত ১৯ জন নিহত হন। শেষ পর্যন্ত দ্বিভাষিক ব্যবস্থার মাধ্যমে আপস করা হয়। ভাষা সেখানে জাতিগত রাজনীতির অংশে পরিণত হয়।
তুরস্ক: কুর্দি ভাষা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিতর্ক
তুরস্কে দীর্ঘদিন কুর্দি ভাষার ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল। বিশেষ করে ১৯৮০ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর কুর্দি ভাষায় প্রকাশনা ও শিক্ষা কার্যত অপরাধে পরিণত হয়।
১৯৯১ সালে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলেও কুর্দি ভাষা আজও পূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি। ভাষা আন্দোলন সেখানে সংখ্যালঘু অধিকার, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত।
ইউক্রেন: ভাষা, সার্বভৌমত্ব ও ভূরাজনীতি
সোভিয়েত আমলে রুশ ভাষা প্রাধান্য পেলেও ইউক্রেনীয় ভাষা ছিল জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক। স্বাধীনতার পর ভাষা নীতি রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়।
২০১৯ সালের রাষ্ট্রভাষা আইন ইউক্রেনীয় ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে। ভাষা সেখানে শুধু সাংস্কৃতিক নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের অংশ হয়ে ওঠে।