ভারতের কলকাতার একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাত বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নিহতদের মধ্যে সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত ও তার পরিবারের তিন সদস্য রয়েছেন। এছাড়া সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার দুই বাসিন্দা এবং সাভারের এক ব্যবসায়ীও অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন।
বুধবার ভোরে কলকাতার ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ নিউমার্কেট এলাকার ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের একটি হোটেলে আগুন লাগে। এ ঘটনায় মোট নয়জনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
প্রাথমিকভাবে বুধবার পাঁচ বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, অগ্নিকাণ্ডে নিহত বাংলাদেশির সংখ্যা সাত।
অন্যদিকে আগুনে আহত ছয় বাংলাদেশি প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন।
একই পরিবারের চারজনের মৃত্যু
নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত (৪০) এবং তার পরিবারের আরও তিন সদস্য রয়েছেন। অন্যরা হলেন তার স্ত্রী আফসানা সিমিন (২৫), তাদের তিন বছর বয়সী সন্তান স্বর্ণশীষ দত্ত এবং দেবাশীষের শ্বশুর আকরাম আলী (৬৪)।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কলকাতায় গিয়েছিলেন দেবাশীষ। অগ্নিকাণ্ডে পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যু হলেও দেশে থাকা তার আট বছর বয়সী আরেক সন্তান বেঁচে গেছে। দেবাশীষের বাবা-মাও জীবিত রয়েছেন।
দেবাশীষ দত্ত আজকের পত্রিকা ও চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
এছাড়া সাভারের প্রসাধনী ব্যবসায়ী আহমেদ বাবু (৩৮) অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন।
চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে প্রাণ গেল সাতক্ষীরার দুজনের
নিহতদের মধ্যে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার দুই বাসিন্দাও রয়েছেন। তারা হলেন উপজেলার তারালী ইউনিয়নের বড়েয়া গ্রামের প্রয়াত ইউনুস আলীর ছেলে আলিমুজ্জামান সাজু এবং একই ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামের ভবেশ সরকারের স্ত্রী রেবতী সরকার।
বুধবার রাত আনুমানিক ১০টার দিকে তাদের মৃত্যুর খবর এলাকায় পৌঁছালে দুই পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে শোক নেমে আসে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, চিংড়িঘেরের ব্যবসায়ী সাজু কোমরের ব্যথার চিকিৎসার জন্য পাঁচ থেকে ছয় দিন আগে ভারতে গিয়েছিলেন। বুধবারই তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই হোটেলের অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান তিনি।
রেবতী সরকারও চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন। প্রায় তিন মাস আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন তিনি। পরে ফলোআপ চিকিৎসার জন্য আবার কলকাতায় যান। সেখানে অবস্থানকালে হোটেলের আগুনে তার মৃত্যু হয়।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিলন সাহা জানান, কলকাতার অগ্নিকাণ্ডে কালীগঞ্জের দুই বাসিন্দার মৃত্যুর বিষয়টি তিনি জানতে পেরেছেন।
তিনি বলেন, “মরদেহগুলো যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে প্রচেষ্টা চলছে।”
নিহতদের পরিবারও দ্রুত মরদেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে।
মরদেহ ফেরাতে কাজ করছে সরকার
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, পরিচয় শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেই নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
তিনি বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে কলকাতায় আমাদের উপহাইকমিশন এবং নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। পরিচয় শনাক্তকরণ ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে যত দ্রুত সম্ভব মরদেহগুলো বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে পারব।”
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, কলকাতায় বাংলাদেশ মিশন এ বিষয়ে কাজ করছে। নিহতদের পরিবারের পক্ষে মরদেহ দেশে আনার ব্যয় বহন করা সম্ভব না হলে সরকার সেই খরচ বহনের বিষয়টিও বিবেচনা করবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কলকাতাস্থ বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের কর্মকর্তারা অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশিদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন।
বাংলাদেশি নাগরিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সহায়তার জন্য উপহাইকমিশন ২৪ ঘণ্টার একটি হেল্পলাইনও চালু করেছে।
ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং কলকাতার বাংলাদেশ উপহাইকমিশন ভারতীয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে নিহত ও আহত বাংলাদেশিদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
ব্যস্ত নিউমার্কেট এলাকায় ভয়াবহ আগুন
কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা নিউমার্কেটের ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের হোটেলটিতে বুধবার ভোরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডে মোট নয়জন প্রাণ হারিয়েছেন।
ঘটনার পর বাংলাদেশি নাগরিকদের হতাহতের তথ্য সংগ্রহ, পরিচয় নিশ্চিত করা এবং মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু করে কলকাতাস্থ বাংলাদেশ উপহাইকমিশন। নিহত সাত বাংলাদেশির মরদেহ প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।