চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) নির্বাহী সদস্য পদে নির্বাচিত হওয়ার প্রায় এক বছর পর শপথ নিয়েছেন ইসলামী ছাত্র শিবিরের আকাশ দাস। ধর্ষণ ও নারীদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের জেরে এত দিন তিনি শপথ নিতে পারেননি। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও চাকসুর সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-ফোরকানের কাছে শপথ নেন তিনি।
শপথ অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সহ-উপাচার্য এবং চাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) উপস্থিত ছিলেন।
উপাচার্য মোহাম্মদ আল-ফোরকান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বিভিন্ন মহলের প্রতিবাদের পর আকাশ দাস আত্মপক্ষ সমর্থন করে ক্ষমা চেয়েছেন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও তাকে নির্দোষ বলা হয়েছে। চাকসুর মেয়াদের বাকি সময়ে তিনি কার্যক্রমে অংশ নেবেন বলে আশা প্রকাশ করেন উপাচার্য।
চাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল থেকে নির্বাহী সদস্য পদে প্রার্থী হয়ে জয়ী হন আকাশ দাস। তবে নির্বাচনের পর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও নারীদের কটূক্তির অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষাপটে আকাশের দেওয়া একটি ফেসবুক পোস্ট নিয়ে ব্যাপক আপত্তি ও প্রতিবাদ শুরু হয়।
গত বছরের ২২ অক্টোবর দেওয়া ওই পোস্টে ধর্ষণের ঘটনায় ভুক্তভোগী নারীকে দায়ী করে মন্তব্য করেছিলেন আকাশ। সমালোচনা শুরু হলে প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে পোস্টটি মুছে দেন তিনি। পরে আরেকটি পোস্টে দুঃখ প্রকাশ করে দাবি করেন, ঘটনার বিস্তারিত না জেনেই তিনি আগের মন্তব্য করেছিলেন।
ওই পোস্টের প্রতিবাদে একই দিন রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। চাকসুর নির্বাচিত নেতাদের অনেকেও আকাশের বক্তব্যের নিন্দা জানান।
পরদিন ২৩ অক্টোবর চাকসু ও হল সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে উপস্থিত ছিলেন না আকাশ। সে সময় তিনি জানিয়েছিলেন, শপথ নিতে গেলে সংঘাতমূলক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় তিনি অনুষ্ঠানে যাননি। পরে বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবাদের মুখে তার শপথ আর অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর আকাশ ছাড়া চাকসুর অন্য নির্বাচিত নেতারা শপথ নেন।
প্রায় এক বছর পর আকাশের শপথ নেওয়া নিয়েও চাকসুর নেতাদের মধ্যে আপত্তি দেখা দিয়েছে।
চাকসু ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আইয়ুবুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হওয়ার জন্য যে নৈতিকতা থাকা প্রয়োজন, আপত্তিকর মন্তব্যের পর আকাশ সেই জায়গা হারিয়েছেন। তার দাবি, চাকসু নির্বাচনে আকাশকে ‘ট্রাম কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল এবং আপত্তিকর মন্তব্যের পর ছাত্রশিবিরও তাকে একপ্রকার দূরে সরিয়ে দেয়। এখন চাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ার সময়ে তাকে শপথ পড়িয়ে দায়মুক্তির চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ার পরই আকাশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। তার ভাষ্য, আকাশকে শপথ পড়ানোর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ধর্ষণের পক্ষে অবস্থানকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করার প্রতিনিধিত্বশীল প্ল্যাটফর্ম চাকসুতে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধ নিয়ে এমন মন্তব্য করা একজন ব্যক্তি কীভাবে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করবেন—সেই প্রশ্নও তোলেন সাজ্জাদ।
অন্যদিকে চাকসুর সাধারণ সম্পাদক সাঈদ বিন হাবিব বলেন, চাকসুর মেয়াদ শেষ হতে প্রায় এক মাস বাকি। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এখন মূল কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গঠনতন্ত্রের প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেবেন এবং সে অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদন্তে ইতিবাচক প্রতিবেদন পাওয়া গেলে আকাশ দাসকে নিয়ে কাজ করতে তাদের আপত্তি নেই বলেও জানান তিনি।
তবে আকাশ দাসের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন চাকসুর ছাত্রী কল্যাণবিষয়ক সম্পাদক নাহিমা আক্তার। তিনি বলেন, আগের ফেসবুক পোস্টের কারণে আকাশকে শপথ নিতে দেওয়া হয়নি। চাকসুর মেয়াদও শেষের দিকে। এ সময়ে তার শপথ নেওয়াকে তিনি যৌক্তিক মনে করেন না।
কার্যনির্বাহী সদস্যরা বিভিন্ন সম্পাদককে কাজে সহযোগিতা করলেও ছাত্রীবিষয়ক কোনো কাজে আকাশের সহযোগিতা নেওয়া হবে না বলেও জানান নাহিমা।



