রায়পুরায় একের পর এক নিখোঁজ ব্যক্তির লাশ উদ্ধার, আতঙ্কে এলাকাবাসী

অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে চালক হত্যার তথ্য পেয়েছে পুলিশ; নিখোঁজ ব্যক্তিদের জীবিত উদ্ধার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় নিখোঁজ হওয়ার পর একের পর এক লাশ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বয়সী পাঁচজনের লাশ উদ্ধারের তথ্য সামনে আসায় মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের জীবিত উদ্ধার করা যাচ্ছে না কেন, এসব ঘটনার পেছনে কারা জড়িত এবং অপরাধ প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন স্বজন ও এলাকাবাসী।

পুলিশ জানিয়েছে, কয়েকটি ঘটনায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে চালকদের হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সব মৃত্যুর পেছনে একই ধরনের অপরাধ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নিখোঁজের পর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত লাশ উদ্ধার হচ্ছে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

নিখোঁজের পর নদী ও জলাশয় থেকে লাশ উদ্ধার

গত ১৮ অক্টোবর সকালে উপজেলার আমিরগঞ্জ ইউনিয়নের হাসনাবাদ এলাকায় আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে আরমান ফকির (২৪) নামে এক যুবকের গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়।

আরমান ভাটিবদরপুর এলাকার সালাহউদ্দিন ফকিরের ছেলে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১১ অক্টোবর অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তিনি নিখোঁজ হন।

এর আগে ১৩ অক্টোবর মরজাল ইউনিয়নের আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে রহমত উল্লাহ (১৮) নামে এক কিশোরের লাশ উদ্ধার করা হয়।

রহমত উল্লাহ চর মরজাল গ্রামের পশ্চিমপাড়ার জামাল মিয়ার ছেলে। তিনি মানসিক ও বাক্‌প্রতিবন্ধী ছিলেন।

তাঁর মৃত্যুর কারণ কিংবা ঘটনার সঙ্গে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

অটোরিকশা ছিনতাইয়ের জন্য মনিরকে হত্যার তথ্য

গত ৫ অক্টোবর উপজেলার আদিয়াবাদ ইউনিয়নের বড়বিল এলাকায় কচুরিপানার মধ্য থেকে মনির হোসেন (১৭) নামে এক অটোরিকশাচালকের লাশ উদ্ধার করা হয়।

মনির চরসুবুদ্ধি ইউনিয়নের শাহ আলম মিয়ার ছেলে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর জীবিকার তাগিদে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে বের হওয়ার পর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন।

এ ঘটনায় পরিবারের করা মামলার তদন্তে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) দুজনকে গ্রেপ্তার করে।

নরসিংদীর ঘোড়াশালের বাগপাড়া ও কুমিল্লার লালমাই থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মনিরের অটোরিকশার চারটি ব্যাটারি উদ্ধার করা হয়।

পিবিআইয়ের তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যেই মনিরকে হত্যা করা হয়েছিল।

তবে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা জানা যায়নি।

চার দিন পর উদ্ধার হয় শিশু তাসকিয়ার লাশ

এর আগে গত ২৯ জুন রায়পুরার পাড়াতলী ইউনিয়নের মধ্যনগর এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় সাত বছর বয়সী শিশু তাসকিয়া।

নিখোঁজ হওয়ার চার দিন পর বাড়ির পাশের একটি জমি থেকে তার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়।

শিশুটির মৃত্যুর কারণ ও তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

এভাবে বিভিন্ন সময়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

বেশি ভাড়ার প্রলোভনে নির্জন স্থানে নেওয়ার অভিযোগ

রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মজিবুর রহমান বলেন, থানায় নিখোঁজের জিডি হলে পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে।

নিখোঁজ ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক এবং মুঠোফোন ব্যবহারকারী হলে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি তাঁর পরিচিত ও সঙ্গে চলাফেরা করা ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

ওসি জানান, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই অটোরিকশাচালক। তদন্তে দেখা যাচ্ছে, বেশি ভাড়ার প্রলোভন দেখিয়ে চালকদের নির্জন স্থানে নিয়ে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চালকদের হত্যাও করা হচ্ছে।

এ ধরনের অপরাধ থেকে সতর্ক থাকতে অটোরিকশাচালক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি স্থানীয়দের

রায়পুরা ফাউন্ডেশনের সভাপতি মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন বলেন, একের পর এক নিখোঁজ ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের ঘটনায় তাঁরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, অপরাধীদের শনাক্ত এবং দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

একই সঙ্গে সন্দেহজনক ঘটনা পুলিশকে জানানো এবং গুজব এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান জয়নুল আবেদীন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, নিখোঁজ ব্যক্তিদের জীবিত উদ্ধারে দ্রুত অনুসন্ধান এবং অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি প্রতিটি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনের মাধ্যমে জনমনে নিরাপত্তার আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।

spot_img
spot_img

অধিক পঠিত

Related Articles