অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে চার দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে অর্থ পাচার করে বিলাসবহুল সম্পদ কেনা এবং বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগ এসেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) কমিশন নতুন এসব অভিযোগ অনুসন্ধানের অনুমোদন দেয়। আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে আগে থেকে চলমান নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধানের সঙ্গে নতুন অভিযোগগুলোও যুক্ত হবে।
দুদকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ রোববার দুপুরে এক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান।
চার দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ
দুদকে জমা পড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করেছেন।
চার দেশে কথিত পাচার করা অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ হাজার কোটি টাকা।
অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব অর্থ দিয়ে বিদেশে বিলাসবহুল ভিলা কেনা এবং বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। দুই বোনজামাই ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের একটি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার অভিযোগও অনুসন্ধান করবে দুদক।
ডিসি পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ এসেছে।
এ ছাড়া দেশের ৩৬ জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে প্রতিটির ক্ষেত্রে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে দুদক।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে দরপত্র বাণিজ্য এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের দরপত্র নিয়েও তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ এসেছে।
বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগ
দুদকে আসা অভিযোগে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
নিয়োগে কোটি কোটি টাকা ঘুষের অভিযোগ
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে।
দুদকে জমা পড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দিয়ে ১০ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে।
এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানের নিয়োগে ৫২ কোটি টাকা এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগে ৬৫ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগও এসেছে।
বাবা ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা কুমিল্লার মুরাদনগরের জন্য ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দের বিষয়টিও অভিযোগে এসেছে। ওই প্রকল্পের বরাদ্দ ও গ্রহণ প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তাঁর বাবা বিল্লাল হোসেন ও সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেন ঠিকাদারদের একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে অর্থ সংগ্রহ করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
দুদক জানিয়েছে, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের এসব অভিযোগ নথিভুক্ত করে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।



