ইয়েমেনের মোখা বন্দর দখলে নিল হুথি, ঝুঁকিতে লোহিত সাগরের নৌপথ

বাব এল-মান্দেব থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরের শহর; ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর হুথিদের সবচেয়ে বড় ভূখণ্ডগত অগ্রগতি

ইয়েমেনের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ বাব এল-মান্দেব প্রণালির কাছের এই শহর দখলকে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর হুথিদের সবচেয়ে বড় ভূখণ্ডগত অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

হুথি ও ইয়েমেন সরকারের কর্মকর্তারা বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) মোখা দখলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। শহরটি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অনুগত বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল।

বাব এল-মান্দেব থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরে

মোখা বন্দর বাব এল-মান্দেব প্রণালি থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট পণ্যবাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।

লোহিত সাগর থেকে এডেন উপসাগর হয়ে ভারত মহাসাগরে প্রবেশের অন্যতম প্রধান পথ হওয়ায় এ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৩ সালের শেষ দিকে হুথিরা বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করার পর বাব এল-মান্দেব দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে বহু জাহাজ কোম্পানি দীর্ঘতর বিকল্প পথ ব্যবহার করছে।

শহরের বিভিন্ন স্থানে হুথি যোদ্ধা

মোখার বাসিন্দারা এপিকে জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার শহরের বিভিন্ন সড়ক ও মোড়ে হুথি যোদ্ধাদের দেখা গেছে। অনেক দোকানপাট বন্ধ ছিল এবং পশ্চিম উপকূল থেকে শহরে প্রবেশের কয়েকটি সড়কও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

মোখার একটি হাসপাতালের তিন চিকিৎসক জানান, হুথিরা হাসপাতালটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তারা সেখান থেকে পালিয়ে যান। শহরের অনেক বাসিন্দাও দক্ষিণে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এডেনের দিকে চলে যাচ্ছেন।

তায়েজেও হুথিদের অগ্রগতি

মোখা অবস্থিত ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় তায়েজ প্রদেশে। সাম্প্রতিক সময়ে ওই প্রদেশের আরও কয়েকটি এলাকায় হুথি বাহিনী অগ্রসর হয়েছে বলে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী ও সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এর আগে হুথিরা আল-শাকিরা এলাকাও দখল করে। এসব অগ্রগতি ইয়েমেন সরকারের সরবরাহপথের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে।

আবারও পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা

ইয়েমেনে এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধের পর ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে বড় ধরনের লড়াই অনেকটাই কমে আসে। মোখা দখলকে সেই যুদ্ধবিরতির পর হুথিদের সবচেয়ে বড় সামরিক সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছে এপি।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুথি ও সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সংঘর্ষ আবার বেড়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে ৭৩ জন আহত হন এবং কয়েকটি তেল ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় আগুন লাগে।

এর আগে ইয়েমেনের জাওফ প্রদেশের একটি কারাগারে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলায় অন্তত ২৩ জন নিহত হন। আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত নতুন করে সংঘর্ষে ইয়েমেনে অন্তত ১৯৪ জন নিহত এবং ২১ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

লোহিত সাগরের বাণিজ্যে নতুন উদ্বেগ

মোখায় হুথিদের উপস্থিতি তাদের লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের আরও কাছে নিয়ে গেছে। বিশেষ করে বাব এল-মান্দেব দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক ও জ্বালানিবাহী জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাতের কারণে ইতোমধ্যে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাব এল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। সৌদি আরবও বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল। তবে হুথিদের নতুন হুমকির কারণে সেই কার্যক্রমও সীমিত হয়েছে।

spot_img
spot_img

অধিক পঠিত

Related Articles