শিশুদের যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘আওয়াজ’

৭ থেকে ১২ বছর বয়সে নিপীড়নের ঘটনা বেশি; বেনামে অভিজ্ঞতা জানাচ্ছেন নারী-পুরুষ উভয়েই

শিশু বয়সে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা বেনামে তুলে ধরতে চালু হয়েছে নতুন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘আওয়াজ ডট বিডি’। গত ৭ সেপ্টেম্বর চালুর পর অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ তাঁদের শৈশবের নিপীড়নের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন।

প্ল্যাটফর্মটির মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশে, বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, শিশুদের যৌন নিপীড়নের প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা। প্রাথমিকভাবে ছেলেশিশুদের নিপীড়নের ঘটনা সামনে আনার লক্ষ্য থাকলেও নারী ভুক্তভোগীরাও তাঁদের শৈশবের অভিজ্ঞতা সেখানে জানাচ্ছেন।

৭ থেকে ১২ বছর বয়সে বেশি ঘটনা

প্ল্যাটফর্মে জমা পড়া তথ্য অনুযায়ী, ৭ থেকে ১২ বছর বয়সে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার ঘটনা তুলনামূলক বেশি। প্রথম ২৪ ঘণ্টায় জমা পড়া তথ্যের ৬৩ শতাংশ ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, তাঁরা একাধিকবার নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। ৩৮ শতাংশ দীর্ঘ সময় ধরে নিপীড়নের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রকাশিত পরিসংখ্যানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক অভিযোগের মধ্যে কওমি মাদ্রাসায় ১৭টি, স্কুলে ৮টি, মসজিদে ৩টি এবং আলিয়া মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি করে ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।

পরিচিত ও আত্মীয়দের বিরুদ্ধেও অভিযোগ

জমা পড়া তথ্যের একটি বড় অংশে অভিযুক্ত ব্যক্তি ভুক্তভোগীর পরিচিত বা আত্মীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ছেলেশিশুদের ক্ষেত্রে ৩৭ শতাংশ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি পরিচিত, ২৮ শতাংশ ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত পরিচিত এবং ১২ শতাংশ ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয় ছিলেন বলে প্ল্যাটফর্মের তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে ৩৩ শতাংশ ঘটনায় অভিযুক্ত হিসেবে দূরসম্পর্কের আত্মীয়, ১৭ শতাংশ ঘটনায় পরিচিত ব্যক্তি এবং আরও ১৭ শতাংশ ঘটনায় নিকটাত্মীয়ের কথা জানানো হয়েছে।

পরিচয় গোপন রাখার দাবি

‘আওয়াজ ডট বিডি’র মূল বার্তা ‘আওয়াজ উঠাও’। ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, সেখানে কোনো নাম, ছবি বা ব্যক্তিগত পরিচয় প্রকাশ করা হয় না।

প্ল্যাটফর্মটির দাবি, ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ, কুকি ব্যবহার বা অনলাইন কার্যক্রম অনুসরণের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। মানুষের দেওয়া বেনামি তথ্যের ভিত্তিতে শিশু যৌন নিপীড়নের একটি সামগ্রিক চিত্র তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা

প্ল্যাটফর্মে একজন ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, শৈশবে রাতে যাতায়াতের সমস্যা হওয়ায় পরিচিত এক ব্যক্তির কাছে আশ্রয় নেওয়ার পর ঘুমানোর সময় তাঁকে যৌন নিপীড়নের চেষ্টা করা হয়। তিনি চিৎকার করলে অভিযুক্ত ব্যক্তি সরে যান।

আরেকজন জানিয়েছেন, শৈশবে এক নিকটাত্মীয় দীর্ঘদিন ধরে তাঁর সঙ্গে যৌন হয়রানিমূলক আচরণ করতেন। শুরুতে ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে না পারলেও পরে তিনি গুরুতর নিপীড়নের শিকার হন।

এ ধরনের আরও অনেক অভিজ্ঞতায় পরিচিত ব্যক্তি, আত্মীয়, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে এসেছে।

কারা তৈরি করেছেন ‘আওয়াজ’

প্ল্যাটফর্মটি তৈরির সঙ্গে প্রধানভাবে যুক্ত রয়েছেন রাকিবুল হাসান ও সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর।

রাকিবুল হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন এবং বর্তমানে অনলাইন উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন। সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল করছেন এবং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

রাকিবুল হাসান জানিয়েছেন, বিশেষ করে মাদ্রাসায় ছেলেশিশুদের যৌন নিপীড়নের ঘটনা সামনে আসার পর তাঁরা এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডকে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আরও সক্রিয় করা এবং সামাজিক সচেতনতা তৈরি করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।

প্ল্যাটফর্মটি কোনো সহায়তা কেন্দ্র বা আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি মূলত তথ্য সংগ্রহ ও সচেতনতা তৈরির একটি উদ্যোগ বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।

spot_img
spot_img

অধিক পঠিত

Related Articles