১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। ঢাকার ইস্কাটনের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল বাংলা চলচ্চিত্রের তুমুল জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর মরদেহ। এরপর পেরিয়ে গেছে ঠিক ৩০ বছর। কিন্তু তাঁর মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড—এ নিয়ে পরিবার ও ভক্তদের প্রশ্নের এখনো অবসান হয়নি।
তিন দশক ধরে তদন্ত, আদালত, চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও পরিবারের আপত্তির মধ্য দিয়ে যাওয়া ঘটনাটি এখন হত্যা মামলা হিসেবে নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। মামলার আসামি অভিনেতা আশরাফুল হক ডন গ্রেফতার হওয়ার পর অন্য আসামিদের গ্রেফতার এবং নতুন তদন্তে কী বেরিয়ে আসে, তা নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার ডন
সালমান শাহর পরিবারের করা হত্যা মামলার আসামি অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে গত ৯ আগস্ট ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গ্রেফতারের পর তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে আদালত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁর রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড শেষে ডনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
দীর্ঘদিন পর মামলার কোনো আসামির গ্রেফতারের ঘটনায় সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে চলমান আইনি প্রক্রিয়া নতুন করে সামনে এসেছে।
১৯৯৭ সালেই হত্যা মামলার আবেদন
সালমান শাহর মৃত্যুর পর থেকেই তাঁর পরিবার ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে মেনে নেয়নি।
মৃত্যুর প্রায় ১০ মাস পর ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই প্রথমবার সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগে মামলা করার আবেদন করা হয়।
এরপর মামলাটি বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করে।
তবে পিবিআইয়ের ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে সালমান শাহর পরিবার।
পিবিআইয়ের প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে যায় পরিবার
পিবিআইয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদন মেনে না নিয়ে তা বাতিল এবং সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে তদন্তের দাবিতে আদালতে রিভিশন আবেদন করা হয়।
এরপর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া চলে।
শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করার পথ তৈরি হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে করা ওই মামলায় বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অভিনেতা আশরাফুল হক ডন।
ডনের গ্রেফতারকে স্বাগত জানিয়েছেন সালমানের মা
ডন গ্রেফতার হওয়ার পর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী।
তিনি জানিয়েছেন, আইনের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা রয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর অভিযোগ, ডন দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে চলাফেরা করলেও তাঁকে আগে গ্রেফতার করা হয়নি।
ডনের বিরুদ্ধে তাঁকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন নীলা চৌধুরী।
নীলা চৌধুরীর ভাষ্য, সালমান শাহই ডনকে চলচ্চিত্রে আসার সুযোগ করে দিয়েছিলেন এবং তাঁকে পরিচিত হতে সহযোগিতা করেছিলেন।
তিনি মনে করেন, সালমান শাহ বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আরও বড় পরিবর্তন আনতে পারতেন। অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র পরিচালনায়ও যাওয়ার ইচ্ছা ছিল তাঁর।
অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন ডন
গ্রেফতার হওয়ার আগে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন আশরাফুল হক ডন।
তাঁর দাবি ছিল, সালমান শাহর মৃত্যুর সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
অভিযোগ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে এবং আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
অন্য আসামিদের গ্রেফতারের দাবি
ডন গ্রেফতার হলেও হত্যা মামলার অন্য আসামিদের সবাই এখনো গ্রেফতার হননি।
ফলে ডনের গ্রেফতারের পর অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তদন্তে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না, তা নিয়ে সালমান শাহর পরিবার ও ভক্তদের আগ্রহ রয়েছে।
সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন ও বিচার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন তাঁর ভক্তরা।
মৃত্যুর ৩০তম বার্ষিকীতেও দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি হয়েছে।
যশোরে ভক্তদের মানববন্ধন
সালমান শাহর মৃত্যুবার্ষিকীতে যশোরে মানববন্ধন করেছেন তাঁর ভক্তরা।
মানববন্ধন থেকে হত্যা মামলার সব আসামিকে দ্রুত গ্রেফতার এবং সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানানো হয়।
তিন দশক ধরে সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের দাবিতে তাঁর পরিবার ও ভক্তদের বিভিন্ন কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় এবারও একই দাবি সামনে এসেছে।
মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ার
বাংলা চলচ্চিত্রে সালমান শাহর যাত্রা দীর্ঘ ছিল না। মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্রজীবনেই তিনি নব্বইয়ের দশকের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়কদের একজন হয়ে ওঠেন।
১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তাঁর। প্রথম সিনেমাতেই মৌসুমীর সঙ্গে তাঁর জুটি দর্শকের বিপুল সাড়া পায়।
এরপর একের পর এক সফল সিনেমায় অভিনয় করেন সালমান শাহ।
মাত্র ২৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
৩০ বছরেও অপেক্ষায় পরিবার ও ভক্তরা
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর—তিন দশক পার হয়েছে।
এই সময়ে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে একাধিক তদন্ত হয়েছে। পিবিআই আত্মহত্যার কথা বলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে, পরিবার সেই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে নতুন করে তদন্তের পর্যায়ে এসেছে।
মামলার আসামি আশরাফুল হক ডনের গ্রেফতারের পর এখন অন্য আসামিদের গ্রেফতার এবং তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতির অপেক্ষায় সালমান শাহর পরিবার ও ভক্তরা।



