‘এলিয়েন এসে গেছে’: এআই নিয়ে বিল গেটসের বড় সতর্কবার্তা

কর্মসংস্থান, জীবপ্রযুক্তি, সাইবার হামলা ও মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি; আগামী পাঁচ বছরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বললেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানুষের ধারণার চেয়েও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে এবং আগামী পাঁচ বছর এ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস।

যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোয় টেলুরাইড চলচ্চিত্র উৎসবে এআই নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনায় তিনি বলেন, প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা বিপুল হলেও কর্মসংস্থান, জীবপ্রযুক্তি, সাইবার হামলা, মানুষের মানসিক ও সামাজিক জীবন এবং এআইয়ের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ—এই পাঁচ ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

এআইয়ের ঝুঁকিকে সিনেমার কল্পবিজ্ঞানের সঙ্গে তুলনা করে গেটস বলেন, চলচ্চিত্রে এলিয়েন পৃথিবীতে এলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নজিরবিহীন সহযোগিতা দেখা যায়। তাঁর ভাষায়, এবার সেই ‘এলিয়েন এসে গেছে’।

প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত এগিয়েছে এআই

শনিবার টেলুরাইড চলচ্চিত্র উৎসবে ‘AI AI AI’ শিরোনামের আলোচনায় অংশ নেন বিল গেটস।

তাঁর সঙ্গে ছিলেন সেন্টার ফর হিউম্যান টেকনোলজির সহপ্রতিষ্ঠাতা ট্রিস্টান হ্যারিস ও আজা রাসকিন। আলোচনাটি পরিচালনা করেন চলচ্চিত্র নির্মাতা জশুয়া ওপেনহাইমার।

গেটস বলেন, এআই প্রযুক্তি যে গতিতে সক্ষম হয়ে উঠেছে, তা তাঁর নিজের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কৈশোর থেকে। ১৩ বছর বয়স থেকেই কোডিং নিয়ে কাজ করছেন তিনি। এখন সেই ক্ষেত্রেই এআই মানুষের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন গেটস।

কোড লেখার ক্ষেত্রে বর্তমান এআই ব্যবস্থা নিজের চেয়েও দক্ষ হয়ে উঠেছে বলে জানান তিনি।

পাঁচ ঝুঁকির কথা বললেন গেটস

এআই নিয়ে নিজের উদ্বেগকে পাঁচটি বড় ভাগে তুলে ধরেন বিল গেটস।

প্রথমটি কর্মসংস্থান। এআইয়ের সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের কাজ মানুষের পরিবর্তে যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে।

দ্বিতীয় ঝুঁকি জীবপ্রযুক্তি। অত্যন্ত সক্ষম এআই ব্যবস্থা জীববিজ্ঞান ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে অপব্যবহৃত হলে তার পরিণতি গুরুতর হতে পারে।

তৃতীয় ঝুঁকি সাইবার হামলা। শক্তিশালী এআই সাইবার আক্রমণের সক্ষমতাও বাড়িয়ে দিতে পারে।

চতুর্থ উদ্বেগ মানুষের মানসিক ও সামাজিক জীবনে এআইয়ের নেতিবাচক প্রভাব।

আর পঞ্চম এবং সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন—মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজের তৈরি অত্যন্ত শক্তিশালী এআই ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না।

উন্নয়ন ধীর করার বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনায় সমর্থন দিতে পারেন

আলোচনায় এআইয়ের আরও শক্তিশালী সংস্করণ তৈরির গতি কমানোর বিষয়টিও আসে।

গেটস বলেন, যদি এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা পাওয়া যায় যার মাধ্যমে এআই উন্নয়নের গতি কমানো কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বর্তমান পর্যায়ে ধরে রাখা সম্ভব হয়, তাহলে তিনি সম্ভবত সেটিকে সমর্থন করবেন।

তবে কাজটি সহজ নয় বলেও জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের একাধিক প্রতিষ্ঠান এখন সবচেয়ে উন্নত এআই তৈরির প্রতিযোগিতায় রয়েছে। ফলে কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা দেশের সিদ্ধান্তে এই প্রতিযোগিতা থামানো কঠিন।

চীনের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনাও দেখছেন গেটস

এআই প্রতিযোগিতায় চীনের অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব—এমন ধারণার সঙ্গে একমত নন বিল গেটস।

তাঁর মতে, সাইবার হামলা, জৈবিক হামলা কিংবা এআইয়ের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো পরিস্থিতি চীনও চাইবে না।

এ কারণে এআইয়ের গুরুতর ঝুঁকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

‘আগামী পাঁচ বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’

সরকার ও নাগরিক সমাজকে এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান গেটস।

তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়।

এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় কোনো ব্যবস্থা নিতে যদি পাঁচ বা ছয় বছর সময় লেগে যায়, তাহলে সেই উদ্যোগ অনেক দেরিতে আসতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

চিকিৎসা-শিক্ষায় সম্ভাবনাও দেখছেন

এআই নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করলেও প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য সুফল অস্বীকার করেননি বিল গেটস।

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শিক্ষায় এআই বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করেন তিনি। দরিদ্র দেশের কৃষকদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা দিতেও প্রযুক্তিটি কাজে লাগানো সম্ভব।

দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বস্বাস্থ্য, অপুষ্টি, পোলিও ও ম্যালেরিয়ার মতো সমস্যা নিয়ে কাজ করা গেটস জানিয়েছেন, এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি তাঁকে নতুন একটি বিষয়কে অগ্রাধিকারের তালিকায় আনতে বাধ্য করেছে।

এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে রাজনৈতিক পর্যায়ে সচেতনতা তৈরিতেও নিজের প্রভাব কাজে লাগাতে চান তিনি।

আরও শক্তিশালী এআই থামানোর আহ্বান

গেটসের আগে টেলুরাইডে ‘The Humanity Dilemma’ শিরোনামের আরেকটি অনুষ্ঠানে এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে বক্তব্য দেন ট্রিস্টান হ্যারিস ও আজা রাসকিন।

তাঁদের বক্তব্য, আরও শক্তিশালী এআই তৈরির প্রতিযোগিতা এত দ্রুত চলছে যে সরকার ও সাধারণ মানুষ তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।

সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হিসেবে তাঁরা সামনে আনেন ভবিষ্যতে অত্যন্ত সক্ষম এআই ব্যবস্থার ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর সম্ভাবনা।

হ্যারিস আরও শক্তিশালী বা ‘ফ্রন্টিয়ার’ এআই তৈরির কাজ সাময়িকভাবে থামানোর আহ্বান জানান।

তবে এআইয়ের সম্ভাব্য সুফলের কথাও স্বীকার করেন তাঁরা। রাসকিন এআইয়ের দ্বিমুখী চরিত্র বোঝাতে বলেন, প্রযুক্তিটি একই সঙ্গে ইউটোপিয়া ও ডিস্টোপিয়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে।

এআই নিয়ে চলচ্চিত্র উৎসবেও উদ্বেগ

এবারের টেলুরাইড চলচ্চিত্র উৎসবে এআই নিয়ে দুটি আলাদা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

উৎসবটির নির্বাহী পরিচালক জুলি হান্টসিঙ্গার এআইকে হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে দর্শকদের এ প্রযুক্তির বিকাশ নিয়ে আরও সক্রিয় ও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান।

হলিউডেও এআই নিয়ে বিতর্ক চলছে। চলচ্চিত্র নির্মাতা ও স্টুডিওগুলো প্রযুক্তিটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। অন্যদিকে অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার ও অন্যান্য সৃজনশীল পেশাজীবী নিজেদের কাজ ও চেহারা এআই দিয়ে ব্যবহার বা প্রতিস্থাপনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ জানাচ্ছেন।

তবে উৎসবে এআইয়ের ইতিবাচক ব্যবহারের উদাহরণও রাখা হয়েছে। ‘Love, Rendered’ নামের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্রে এক বৃদ্ধ দম্পতির ৭০ বছর আগের প্রথম দেখা ও প্রেমের স্মৃতি পুনর্নির্মাণে এআই ব্যবহার করা হয়েছে।

সিনেমার HAL-এর প্রসঙ্গ

টেলুরাইডে এআই নিয়ে আলোচনার দিনই উৎসবের কর্মসূচিতে ছিল স্ট্যানলি কুবরিকের বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান চলচ্চিত্র ‘2001: A Space Odyssey’।

সিনেমাটির HAL 9000 চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে পরিচিত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চরিত্রগুলোর একটি।

বর্তমান এআই ব্যবস্থার ওপর যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ না থাকার বিষয়টি বোঝাতে গেটস HAL-এর প্রসঙ্গও টানেন।

তাঁর আশঙ্কা, মানুষ এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে একটি শক্তিশালী এআই ব্যবস্থাকে বন্ধ হতে বললেও সেটি মানুষের নির্দেশ মেনে চলবে কি না, সেই নিশ্চয়তা থাকবে না।

এই সম্ভাবনাই এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির মধ্যে মানুষের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার প্রশ্নটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে বলে মনে করেন তিনি।

spot_img
spot_img

অধিক পঠিত

Related Articles