সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জন্য নতুন এক স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা সামনে এসেছে। বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘ ও তাদের শিকার প্রাণীর মল নমুনা পরীক্ষা করে গবেষকেরা বাঘের মধ্যে পরজীবী সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি পেয়েছেন।
বাংলাদেশ বন বিভাগের উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণায় বাঘের ৮৫ দশমিক ৩ শতাংশ নমুনায় পরজীবী সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। একই গবেষণায় রেসাস বানরের ক্ষেত্রে এই হার ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশ, হরিণে ৭৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং বন্য শূকরে ৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, সুস্থ পূর্ণবয়স্ক বাঘ সাধারণত সীমিত পরিমাণ পরজীবী সামলে নিতে পারে। কিন্তু অপুষ্টি, আঘাত, বয়সজনিত দুর্বলতা বা অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত হলে এসব পরজীবী প্রাণীটির শারীরিক সক্ষমতা দ্রুত কমিয়ে দিতে পারে।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে সংগ্রহ করা হয় নমুনা
বাংলাদেশ বন বিভাগের দায়িত্বে গবেষকেরা ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দুই ধাপে সুন্দরবনের বিভিন্ন বন্য প্রাণীর মল নমুনা সংগ্রহ করেন।
পরবর্তী আণবিক পরীক্ষায় কয়েক ধরনের উল্লেখযোগ্য পরজীবী শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে ছিল টক্সোকারা ক্যাটি ও স্ট্রংগিলয়েডিস প্রজাতির গোলকৃমি, একাইনোকক্কাস গ্রানুলোসাস, লিভার ফ্লুক এবং স্পাইরোমেট্রা প্রজাতির ফিতাকৃমি।
গবেষণাটির অন্যতম লেখক এবং সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি ও ইমিউনোলজি বিভাগের অধ্যাপক সুলতান আহমেদের মতে, সুন্দরবনের ওপর মানুষের হস্তক্ষেপ কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বনসংলগ্ন বসতিও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের সুন্দরবন ঘেঁষা বসতিগুলো বন থেকে গড়ে প্রায় ৪৫০ দশমিক ৭ মিটার দূরে হলেও মধ্যম দূরত্ব মাত্র ১০০ মিটার। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক পরিবার বনসীমার খুব কাছাকাছি বসবাস করে।
এই ঘনিষ্ঠতার কারণে গৃহপালিত প্রাণী ও বন্য প্রাণী একই পানি, চারণভূমি বা পরিবেশ ব্যবহার করলে এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতিতে রোগজীবাণু ও পরজীবী ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।
ভারত ও নেপালের সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতেও একই ধরনের সতর্কতা উঠে এসেছে। মহারাষ্ট্রে বাঘ ও চিতাবাঘের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় বিভিন্ন ধরনের অন্ত্রের পরজীবী শনাক্ত করা হয়। নেপালের চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্কেও মানুষের বসতি ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থলের নৈকট্যকে পরজীবী সংক্রমণের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
গবাদিপশু ও কুকুর হতে পারে সংক্রমণের উৎস
ভারতের ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউটের বন্য প্রাণী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান পরাগ নিগামের মতে, গৃহপালিত গরু-মহিষ ও অবাধে ঘুরে বেড়ানো কুকুর বিভিন্ন কৃমি, ফ্লুক ও টিকবাহিত রোগজীবাণুর গুরুত্বপূর্ণ বাহক হতে পারে।
বন্য প্রাণী ও গৃহপালিত প্রাণী যখন একই জলাশয় বা চারণভূমি ব্যবহার করে, তখন সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঘ কখনো সংক্রমিত গবাদিপশু খাওয়ার মাধ্যমে সরাসরি এবং কখনো দূষিত পানি, পরিবেশ বা সংক্রমিত শিকার প্রাণীর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে পরজীবীর সংস্পর্শে আসতে পারে।
দুর্বল বাঘের জন্য বেশি বিপজ্জনক
পরজীবী সংক্রমণকে বাঘের সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন না গবেষকেরা। চোরা শিকার, বন উজাড়, আবাসস্থল ক্ষয় এবং শিকার প্রাণীর ঘাটতি এখনো রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জন্য বড় ঝুঁকি।
তবে এসব সমস্যায় দুর্বল হয়ে পড়া বাঘের শরীরে পরজীবীর প্রভাব অনেক বেশি হতে পারে।
পরাগ নিগামের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পরজীবী ধীরে ধীরে বাঘের স্বাস্থ্য দুর্বল করতে পারে। গুরুতর সংক্রমণে রক্তস্বল্পতা, অপুষ্টি এবং শিকার করার সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
বন্য শিকার ধরতে অক্ষম কোনো দুর্বল বাঘ তখন সহজ শিকারের জন্য লোকালয়ের গবাদিপশুর দিকে ঝুঁকতে পারে। এতে মানুষ-বাঘ সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
শাবকদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি
বিশেষজ্ঞদের বড় উদ্বেগ বাঘের শাবকদের নিয়ে।
তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা পুরোপুরি গড়ে ওঠার আগেই গোলকৃমি বা ফ্লুকের মতো পরজীবীর ভারী সংক্রমণ গুরুতর অসুস্থতা এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
ছোট বা বিচ্ছিন্ন বাঘের আবাসস্থলে জিনগত বৈচিত্র্য কমে গেলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তখন কোনো সংক্রমণ পুরো স্থানীয় বাঘের জনগোষ্ঠীর ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
নেপালের প্রাণিবিদ বাবিতা মহার্জনের মতে, একটি প্রাণীর শরীরে একাধিক পরজীবীর সংক্রমণ একক সংক্রমণের তুলনায় বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। এতে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে অন্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।
ভুটানে পরজীবী সংক্রমণে বাঘের মৃত্যু
পরজীবী যে বাঘের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে, তার একটি বিরল উদাহরণ পাওয়া গেছে ভুটানে।
২০১৮ সালে দেশটিতে একটি বেঙ্গল টাইগারের শরীরে নিউরোসিস্টিসারকোসিস শনাক্ত করা হয়। মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম টেনিয়া সোলিয়াম বা ‘পর্ক টেপওয়ার্ম’-এর কারণে বাঘটির কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত সেটি মারা যায়।
২০২১ সালের একটি গবেষণায় ঘটনাটি বিশ্লেষণ করে বলা হয়, বাঘটি কীভাবে এই পরজীবীর সংস্পর্শে এসেছিল তা নিশ্চিত নয়। তবে মানবমল দ্বারা দূষিত পানি বা খাদ্য অথবা সরাসরি এমন পরিবেশের মাধ্যমে সংক্রমণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সুন্দরবনে দীর্ঘমেয়াদি রোগ নজরদারির পরামর্শ
সুন্দরবনের বাঘ ও তাদের শিকার প্রাণীর স্বাস্থ্য রক্ষায় গবেষকেরা সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি বন্য প্রাণী রোগ নজরদারি কর্মসূচির পরামর্শ দিয়েছেন।
এ ক্ষেত্রে নিয়মিতভাবে মল নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার মাধ্যমে পরজীবী এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগ পর্যবেক্ষণ করার কথা বলা হয়েছে।
পাশাপাশি সুন্দরবনের আশপাশের গবাদিপশু ও অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণীর পরজীবী নিয়ন্ত্রণ, বন বিভাগের মাঠকর্মীদের নির্দিষ্ট বিরতিতে কৃমিনাশক দেওয়া এবং একটি কেন্দ্রীয় বন্য প্রাণী রোগ নির্ণয় পরীক্ষাগার স্থাপনের প্রস্তাবও এসেছে।
শিকার প্রাণী বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অসুস্থ বাঘের চিকিৎসা করাই সমাধান নয়। বরং পুরো বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে হবে।
বনে পর্যাপ্ত হরিণ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক শিকার থাকলে বাঘ ভালো শারীরিক অবস্থায় থাকতে পারে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা স্বাভাবিকভাবে পরজীবী নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে।
এ কারণে তৃণভূমি ও জলাশয় ব্যবস্থাপনা, শিকার প্রাণীর সংখ্যা পর্যবেক্ষণ এবং তাদের মধ্যেও রোগ নজরদারির পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকেরা।
সুন্দরবনের আশপাশের মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি, গবাদিপশুর নিয়মিত কৃমিনাশক ব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রিত পশুচারণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের বার্তা স্পষ্ট—পরজীবী হয়তো রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সবচেয়ে দৃশ্যমান শত্রু নয়, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থল সংকোচন, খাদ্যাভাব ও মানুষ-বন্য প্রাণীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত হলে এই অদৃশ্য হুমকিও বাঘ সংরক্ষণে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
Source:Original article



