চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। তবে এখনো সন্ধান মেলেনি ২ হাজার ৩৮ শিশুর। অর্থাৎ নিখোঁজ হিসেবে নথিভুক্ত শিশুদের প্রায় ১৩ শতাংশ এখনো উদ্ধার হয়নি।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) পুলিশ সদরদপ্তর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে শিশু নিখোঁজের এই পরিসংখ্যান প্রকাশের পাশাপাশি কী কারণে শিশুরা ঘর বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে বছরের প্রথম সাত মাসে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হওয়ার তথ্য প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। পুলিশ বলছে, ওই সব প্রতিবেদনের অনেকটিতে পরবর্তী সময়ে কত শিশু উদ্ধার হয়েছে বা নিজেরাই পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে, সে তথ্য না থাকায় পূর্ণাঙ্গ চিত্র উঠে আসেনি।
এরপর সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে পুলিশ সদরদপ্তর।
নিখোঁজের ৯৭ শতাংশই ১০ থেকে ১৭ বছরের
পুলিশের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিখোঁজ হিসেবে নথিভুক্ত শিশুদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কিশোর-কিশোরী।
জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ৪৭৪টি জিডি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা ফিরে এসেছে। এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি ৬৮ জনের।
অন্যদিকে, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা ফিরে এসেছে। এখনো নিখোঁজ ১ হাজার ৯৭০ জন।
এই হিসাবে মোট নিখোঁজের ঘটনার প্রায় ৯৭ শতাংশই ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের।
ছোট শিশুরা কেন নিখোঁজ হয়
শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি সাধারণ কারণ চিহ্নিত করেছে পুলিশ।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত কোনো স্থানে গিয়ে পথ হারানো এর অন্যতম কারণ। অল্প বয়সের কারণে অনেক শিশু নিজের বা বাবা-মায়ের পূর্ণ নাম, বাড়ির ঠিকানা কিংবা যোগাযোগের তথ্য সঠিকভাবে বলতে পারে না।
আবার কোনো কোনো শিশু একা বাড়ি ফেরার চেষ্টা করতে গিয়ে ভুল পথে চলে যায় এবং শেষ পর্যন্ত অন্য এলাকায় পৌঁছে যায়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিশুটি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর থানায় নিখোঁজের জিডি করা হয়। পরে অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ বা স্থানীয় মানুষের সহায়তায় তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।
কিশোর-কিশোরীদের ঘর ছাড়ার পেছনে যেসব কারণ
১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের নিখোঁজ হওয়ার কারণ তুলনামূলকভাবে ভিন্ন ও জটিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া, পড়ালেখার চাপ, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কিছু কিশোর-কিশোরীর মধ্যে স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষাও ঘর ছাড়ার কারণ হয়ে ওঠে।
পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা আদায়ের কৌশল হিসেবে কাউকে না জানিয়ে চলে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ছাড়া অনৈতিক কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার পর পরিবার বা সমাজের কাছে ধরা পড়ার আশঙ্কা কিংবা লজ্জা থেকে পালিয়ে থাকার ঘটনাও পুলিশের পর্যবেক্ষণে এসেছে।
ফলে শিশু নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনাকে একই ধরনের ঘটনা হিসেবে বিবেচনা না করে বয়স, পারিবারিক পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদাভাবে বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে পুলিশের ব্যাখ্যায়।
উদ্ধার বা ফিরে এসেছে ৮৭ শতাংশ
সাত মাসের সামগ্রিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার জিডি হলেও তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জন ইতোমধ্যে উদ্ধার হয়েছে অথবা নিজেরাই পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে।
শতাংশের হিসাবে এটি মোট নথিভুক্ত নিখোঁজ শিশুর প্রায় ৮৭ শতাংশ।
তারপরও ২ হাজার ৩৮ শিশুর এখনো কোনো সন্ধান না পাওয়া উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে তাদের মধ্যে ১ হাজার ৯৭০ জনই ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী।
পুলিশ সদরদপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী, গণমাধ্যমে শুধু মোট নিখোঁজের সংখ্যা প্রকাশ করলে বর্তমান পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। কতজন পরবর্তী সময়ে ফিরে এসেছে বা উদ্ধার হয়েছে, সেই তথ্যও পাশাপাশি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অনলাইন জিডিতেও বেড়েছে পরিসংখ্যান
পুলিশ সদরদপ্তর বলছে, নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডির সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে পুলিশি সেবা সহজলভ্য হওয়ারও একটি ভূমিকা রয়েছে।
অনলাইন জিডি সুবিধা চালুর ফলে এখন আগের তুলনায় সহজেই নিখোঁজের ঘটনা পুলিশের কাছে নথিভুক্ত করা যাচ্ছে। ফলে জিডির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে পুলিশের ব্যাখ্যা।
পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ১৭ হাজার ৮০৮টি জিডি হয়েছিল।
২০২৪ সালে এই সংখ্যা কমে ১৬ হাজার ৪১৪টিতে দাঁড়ায়। কিন্তু ২০২৫ সালে তা আবার বেড়ে ২২ হাজার ৫৫০টিতে পৌঁছায়।
তবে ওই তিন বছরে নিখোঁজ হিসেবে নথিভুক্ত শিশুদের কতজন পরবর্তী সময়ে উদ্ধার হয়েছিল বা নিজেরাই ফিরে এসেছিল এবং কতজন এখনো নিখোঁজ রয়েছে—সেই তুলনামূলক তথ্য পুলিশ সদরদপ্তরের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া হয়নি।
সংখ্যার আড়ালে এখনো নিখোঁজ দুই হাজারের বেশি শিশু
পুলিশের ব্যাখ্যায় ১৫ হাজারের বেশি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার পরিসংখ্যানের একটি বড় অংশের পরবর্তী অবস্থান পরিষ্কার হয়েছে। অধিকাংশই উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে।
তারপরও বছরের প্রথম সাত মাসে ২ হাজার ৩৮ শিশুর সন্ধান না মেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের জায়গা হিসেবে রয়ে গেছে।
বিশেষ করে নিখোঁজদের মধ্যে কিশোর-কিশোরীর সংখ্যা অত্যন্ত বেশি হওয়ায় পারিবারিক সম্পর্ক, মানসিক চাপ, পড়াশোনার পরিবেশ, বন্ধু ও সহপাঠীদের প্রভাব এবং শিশুদের অনলাইন ও অফলাইন সামাজিক যোগাযোগের মতো বিষয়গুলোর প্রতিও বাড়তি মনোযোগের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।



