সব নাগরিকের সমান সাংবিধানিক অধিকার ও ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু হিসেবে বিভাজনের পরিবর্তে সবাইকে সমঅধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের জমি নিয়ে অতীতের বিরোধের প্রসঙ্গও তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার অভিযোগ, মন্দিরের বিপুল পরিমাণ জমি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দখলে নেওয়া হয়েছিল।
তবে তার এই অভিযোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগ বা সংশ্লিষ্ট কারও বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরের জমি নিয়ে যা বললেন
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৯৬ সালে তিনি ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য থাকাকালে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের সম্পত্তিসংক্রান্ত বিষয়টি সরেজমিনে দেখেছিলেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা যায়, মন্দিরের প্রায় আড়াই একর জমি সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত অবস্থায় ছিল। তবে অবশিষ্ট অধিকাংশ সম্পত্তি রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের দখলে চলে গিয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যে আড়াই একর জমি তখনও হাতবদল হয়নি, সেখানে শ্মশান থাকায় সেটি দখল হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিল।
জমিগুলোর মালিকানা বিভিন্ন সময়ে হাতবদলের কারণে পরবর্তী সময়ে জটিল আইনি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
‘সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু বলে কিছু নেই’
জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও নাগরিক সমতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান সব নাগরিককে সমান অধিকার দিয়েছে। ফলে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে কম বা বেশি অধিকারসম্পন্ন হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু বলে কিছু নেই। আমরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক।”
তার মতে, একজন নাগরিক কোন ধর্ম পালন করেন, সেটি তার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়। রাষ্ট্রের কাছে নাগরিক হিসেবে সবার অধিকার সমান হওয়া উচিত।
ধর্মীয় পরিচয় যেন কোনো নাগরিকের রাষ্ট্রীয় অধিকার, নিরাপত্তা বা সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেটি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
নাগরিক সুবিধায় বৈষম্য না করার প্রতিশ্রুতি
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিককে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হবে না।
তিনি দেশের সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে ধর্মীয় সম্প্রীতির পাশাপাশি গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়টিও উঠে আসে। দেশে গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রাখতে সব শ্রেণি-পেশা ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের সহযোগিতা চান তিনি।
গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রসঙ্গ
অনুষ্ঠানে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার দাবি, বর্তমান সরকারের সময়ে কোনো নাগরিক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিংবা রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হননি।
এটিকে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
তবে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য সরকারের নিজস্ব মূল্যায়ন। দেশে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিংবা রাজনৈতিক নিপীড়ন ঘটেছে কি না—এ ধরনের বিষয় স্বাধীন তদন্ত, আদালতের সিদ্ধান্ত ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পৃথকভাবে যাচাইযোগ্য।
জন্মাষ্টমীতে সম্প্রীতির বার্তা
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় নাগরিকদের মধ্যে বিভাজনের কারণ হবে না।
তার বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল—সংবিধানের অধীনে একজন মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা অন্য কোনো ধর্মের অনুসারীর নাগরিক অধিকার একই।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে হলে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে কোনো বৈষম্য না করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক নাগরিক যেন সমান মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সুযোগ নিয়ে বসবাস করতে পারেন, সরকার সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায়।



