ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সংসদ সদস্য শামীম কায়সার লিংকনকে মনোনীত করার সম্ভাবনার বিরোধিতা করেছে ‘সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ বাংলাদেশ’। সংগঠনটির নেতারা দাবি করেছেন, লিংকনের ধর্মীয় মতাদর্শ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ও আলেম সমাজের প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার পরিবর্তে উলামায়ে কেরামের সঙ্গে আলোচনা করে একজন ‘যোগ্য, অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য’ ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
রাজধানীর খিলগাঁও চৌরাস্তায় জামিয়া ইসলামিয়া মাখজানুল উলুম মিলনায়তনে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ দাবি জানানো হয়। আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়ত বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী সেখানে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
লিখিত বক্তব্যে রাব্বানী দাবি করেন, শামীম কায়সার লিংকন ‘লা-মাজহাব’ মতাদর্শে বিশ্বাসী এবং পীর-মাশায়েখ, তাবলিগ জামাত ও প্রচলিত চার মাজহাবের বিষয়ে তার অবস্থান বিরোধিতাপূর্ণ। এ কারণে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতো একটি সংবেদনশীল দায়িত্বে তাকে মনোনয়নের সম্ভাবনার খবর আলেম সমাজ ও তাদের অনুসারীদের প্রত্যাশার পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে লিংকনের ধর্মীয় বিশ্বাস ও বিভিন্ন ইসলামি ধারা সম্পর্কে তার অবস্থান নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত এসব দাবির পক্ষে আলাদা কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে লিংকনের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
‘ধর্ম মন্ত্রণালয় অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিশেষায়িত’
মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী বলেন, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি ‘অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিশেষায়িত ক্ষেত্র’। তাদের মতে, ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এবং দেশের আলেম সমাজের আস্থাভাজন কোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে এ দায়িত্ব দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রচলিত ধর্মীয় সংস্কৃতি ও রীতিনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি দায়িত্বে থাকলে আলেমদের মর্যাদা রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে।
সরকারের প্রতি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “এ চিন্তাভাবনা অবিলম্বে বাতিল করে তা পুনর্বিবেচনা করা হোক। একই সঙ্গে উলামায়ে কেরামের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে একজন যোগ্য, অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে এ পদের দায়িত্ব অর্পণ করা হোক।”
সংগঠনটির দাবি, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান হানাফি মাজহাব অনুসরণ করেন। সেই বাস্তবতায় ভিন্ন ধর্মীয় মতাদর্শের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে যাকে তারা বিবেচনা করেন, এমন কাউকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে বসানো তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
সরকারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরির হুঁশিয়ারি
প্রেস ব্রিফিংয়ে নেতারা দাবি করেন, সাম্প্রতিক নির্বাচনে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় আনার ক্ষেত্রে দেশের উলামায়ে কেরামের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। এ কারণে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আলেমদের মতামত উপেক্ষা করা হলে তা সরকারের জন্য ‘আত্মঘাতী’ হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তারা।
তাদের ভাষ্য, এই আপত্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়; বরং ধর্মীয় মর্যাদা এবং কওমি আলেমদের স্বার্থ রক্ষার জন্য তোলা হয়েছে।
তারা সতর্ক করে বলেন, দাবি উপেক্ষা করে লিংকনকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী করা হলে সরকার ও উলামায়ে কেরামের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম আল্লামা শাহ মুহিববুল্লাহ বাবুনগরীর সুসম্পর্কের কথাও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। নেতারা বলেন, বর্তমানে সরকার ও আলেম সমাজের মধ্যে যে পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক রয়েছে, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী নিয়োগে তাদের মতামত উপেক্ষিত হলে সেই সম্পর্কে ‘ফাটল’ ধরতে পারে।
‘চিন্তাভাবনা থেকে ফিরে আসুন’
প্রেস ব্রিফিংয়ে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নায়েবে আমির এবং খতমে নবুওয়ত সংরক্ষণ কমিটির আমির মাওলানা আব্দুল হামিদ পীর সাহেব মধুপুরও বক্তব্য দেন।
তিনি সরকারের প্রতি শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী করার চিন্তা থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।
আব্দুল হামিদ বলেন, “পীর-আউলিয়ার দেশে মাজহাববিরোধী শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত করার চিন্তাভাবনা থেকে ফিরে আসুন।”
তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আলেমদের প্রত্যাশা উপেক্ষা করে লিংকনকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী করা হলে ‘ঈমানদার দেশবাসী ফুঁসে উঠবে’, যা সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহসভাপতি মাওলানা মুফতি নাজমুল হাসান কাসেমী, জামিয়া ইসলামিয়া মাখজানুল উলুম খিলগাঁওয়ের মুহতামিম মাওলানা জহুরুল ইসলাম, হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশিরুল্লাহ, জামিয়া আহলিয়া দারুল উলুম হাটহাজারীর শিক্ষক মাওলানা মোহাম্মদ শফি, ওয়ায়েজ মাওলানা গাজী ইয়াকুব উসমানী, মাওলানা আবু আম্মার আবদুল্লাহ, মুফতি রিদওয়ান রফিকী, মাওলানা রাশেদ বিন নূর, হেফাজতের দফতর সম্পাদক মাওলানা আফসার মাহমুদ, মুফতি আল আমিন ও মাওলানা সালেহ আহমদ আজম।
