আদালতের রায়ের পর বিশ্বজুড়ে নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ ট্রাম্পের

আগের শুল্কনীতি অবৈধ ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন আইনের আওতায় নির্বাহী আদেশে সই করেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্কনীতিকে অবৈধ ঘোষণা করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশ্বজুড়ে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নির্বাহী আদেশে সই করেছেন সাবেক এই প্রেসিডেন্ট। আদালতের রায়ে যেখানে বলা হয়েছে, একতরফাভাবে শুল্ক আরোপ করে ট্রাম্প ফেডারেল আইন লঙ্ঘন করেছেন, সেখানে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে তিনি অন্য আইনের আওতায় নতুন শুল্ক কার্যকরের ঘোষণা দিলেন।

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ৬–৩ ভোটের রায়ে ট্রাম্পের আগের শুল্কনীতি বাতিল করে বলেন, তিনি ১৯৭৭ সালের ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) প্রয়োগ করতে গিয়ে নিজের সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন। আদালতের মতে, আইইইপিএ প্রেসিডেন্টকে জরুরি পরিস্থিতিতে বাণিজ্য ‘নিয়ন্ত্রণের’ ক্ষমতা দিলেও, সেটি ব্যবহার করে বিশ্বের প্রায় সব দেশের ওপর ব্যাপক ও স্থায়ী শুল্ক আরোপের অনুমতি দেয় না।

রায়ে বলা হয়, এ ধরনের শুল্ক আরোপ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতিতে গুরুতর ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করে উল্লেখ করে, কর ও শুল্ক নির্ধারণের ক্ষমতা সংবিধান অনুযায়ী কংগ্রেসের হাতে, প্রেসিডেন্টের নয়।

প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস তার মতামতে লেখেন, “শুল্ক আরোপের মতো অস্বাভাবিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হলে প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন দেখাতে হবে। এই ক্ষেত্রে তা দেখানো হয়নি।” তিনি আরও বলেন, আইইইপিএ আইনে ‘নিয়ন্ত্রণ’ ও ‘আমদানি’ শব্দ থাকলেও, এর অর্থ এই নয় যে প্রেসিডেন্ট ইচ্ছামতো যেকোনো দেশের ওপর যেকোনো হারে অনির্দিষ্টকালের জন্য শুল্ক বসাতে পারবেন।

আদালতের এই রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শুক্রবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তিনি বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপের নির্বাহী আদেশে সই করেছেন। তিনি জানান, ওভাল অফিসে বসেই এই আদেশে সই করা হয়েছে এবং এটি “প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে” কার্যকর হবে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, নতুন শুল্ক আগামী মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হবে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট তার আগের শুল্ক পরিকল্পনার বড় অংশ অবৈধ ঘোষণা করার পরই ট্রাম্প সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি আইনের আশ্রয় নিয়ে এই নতুন সিদ্ধান্ত নেন। নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়েছে ‘সেকশন ১২২’ নামে পরিচিত একটি আইনের আওতায়, যা অতীতে কখনো ব্যবহার করা হয়নি। এই আইনে প্রেসিডেন্টকে সর্বোচ্চ দেড়শ দিনের জন্য ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে এই সময়ের মধ্যেই কংগ্রেসকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

এই আদেশে কিছু পণ্যে ছাড় রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ, সার, কমলা ও গরুর মাংসের মতো কৃষিজ পণ্য, ওষুধ, ইলেকট্রনিক্স এবং কিছু নির্দিষ্ট গাড়ি। তবে কোন কোন পণ্য ঠিক কীভাবে ছাড় পাবে, সে বিষয়ে আদেশে স্পষ্ট তালিকা দেওয়া হয়নি, যা নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ইউএসএমসিএ-এর আওতায় কানাডা ও মেক্সিকোর বেশিরভাগ পণ্য এই নতুন শুল্কের বাইরে থাকবে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। তবে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইতোমধ্যে যেসব দেশ বাণিজ্য চুক্তি করেছে, তারাও এখন আর নিজ নিজ চুক্তির শুল্ক হারে সুবিধা পাবে না। তাদেরও সেকশন ১২২-এর আওতায় বৈশ্বিক ১০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে।

আদালতের রায়কে ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরুদ্ধে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের বড় জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই রায়ের ফলে, আইইইপিএর আওতায় গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার শুল্ক আদায় করেছে, তা ফেরত পাওয়ার পথ খুলে যেতে পারে। তবে ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, আইনি লড়াই ছাড়া এই অর্থ ফেরত দেওয়া হবে না। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “এই আইনি প্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে।”

তিনি আরও দাবি করেন, শুল্ক আরোপের জন্য তার হাতে আরও অনেক আইন রয়েছে। ট্রাম্পের ভাষায়, “আমাদের কাছে বিকল্প আছে—দারুণ সব বিকল্প। এর মাধ্যমে আমরা আরও বেশি অর্থ আয় করতে পারি। আমরা আরও শক্তিশালী হব।”

সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ট্রাম্পের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া ছয় বিচারকের মধ্যে ছিলেন প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস, তিনজন উদারপন্থি বিচারক এবং ট্রাম্পের নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারক অ্যামি কনে ব্যারেট ও নেইল গোরসাচ। তবে রক্ষণশীল বিচারক ক্লারেন্স থমাস, ব্রেট কাভানহ ও স্যামুয়েল আলিতো এই রায়ের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন নিজের মনোনীত বিচারকদেরও। তিনি বলেন, “রিপাবলিকানদের হাতে নিয়োগপ্রাপ্ত যে বিচারকরা আমার শুল্কনীতির বিপক্ষে ভোট দিয়েছে, তাদের নিয়ে আমি ভীষণ লজ্জিত।” তিনি তাদের “বোকা”, “তোষামোদে লিপ্ত” এবং “দেশপ্রেমহীন” বলেও আক্রমণ করেন।

এই রায়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিটে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক প্রায় শূন্য দশমিক সাত শতাংশ বেড়ে দিনের লেনদেন শেষ করে। বিনিয়োগকারীরা শুল্কজনিত চাপ কমার সম্ভাবনায় স্বস্তি প্রকাশ করলেও, নতুন করে ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের ফলে সেই স্বস্তি কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার সীমা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের নতুন শুল্ক সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় আরও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, যার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

spot_img
spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles