বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের আট মাসের মধ্যে তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগ ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘোষণার পর প্রশ্ন উঠেছে, এসব ঘটনা কি দল ও সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত, নাকি ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের প্রতিফলন?
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। এর আগে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।
তবে আলোচিত চারটি পদত্যাগের কারণ ও পরিস্থিতি এক নয়। কোনোটি ঘটেছে বিতর্কের পর, কোনোটি প্রশাসনিক দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের প্রেক্ষাপটে, আবার কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত কারণ দেখানো হয়েছে।
অস্ত্র হাতে অভিযানের পর ইশরাকের পদত্যাগ
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে অস্ত্র হাতে অংশ নেন ইশরাক হোসেন। প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র বহনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
সমালোচনার মধ্যে সোমবার দুপুরে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি।
ইশরাকের দাবি, সরকারের কর্মকাণ্ড যাতে তাঁর কারণে ম্লান না হয়, সে জন্য স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে সাধারণ কর্মী হিসেবে মাদকবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।
পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও তাঁর পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিতর্কের পর পদ ছাড়েন ফেরদৌসী মিষ্টি
এর আগে গত ১ অক্টোবর সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেন।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি ও যুবদল নেতার নাম সামনে আসে।
ওই ঘটনার পর রাজনৈতিক সমালোচনার মুখে পড়েন ফেরদৌসী মিষ্টি।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় তিনি স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরে তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়।
তবে হামলার ঘটনায় ফেরদৌসী মিষ্টির ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
মন্ত্রিত্ব ছাড়েন স্বপন ও দীপেন দেওয়ান
গত ২২ আগস্ট তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান জহির উদ্দিন স্বপন।
এর আগের দিন মন্ত্রণালয়টির দায়িত্ব দেওয়া হয় আন্দালিভ রহমান পার্থকে। তবে মন্ত্রিত্ব ছাড়ার দিনই স্বপনকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ফলে তাঁর পদত্যাগকে সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দায়িত্ব পরিবর্তনের নেপথ্য কারণ নিয়েও আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
অন্যদিকে গত ১ জুন শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন দীপেন দেওয়ান।
তাঁর পদত্যাগের সময় পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন এবং রাঙামাটি বিএনপির অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। তবে এসব বিষয়ের সঙ্গে পদত্যাগের সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত হয়নি।
শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিয়ে বিএনপির বক্তব্য
দলের নেতাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, সরকারের যত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিই হোন না কেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি দলের সংসদীয় সভায় চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান।
তবে চারটি পদত্যাগকে একই ধরনের সাংগঠনিক শাস্তি হিসেবে চিহ্নিত করার মতো তথ্য নেই। প্রতিটি ঘটনার পটভূমি আলাদা।
ফলে এসব পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বিএনপি কী রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে, তা নিয়ে আলোচনা থাকলেও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।



