নয় মাসে ৫১৮ সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার, রাজনৈতিক গ্রেপ্তার ৫৬৪৪ জন

মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএসের প্রতিবেদন; গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ৮৬ শতাংশ আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট, গণপিটুনিতে নিহত ১৮৭ জন

চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশে সহিংসতা, হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন অন্তত ৫১৮ জন সাংবাদিক। একই সময়ে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় করা মামলা ও অন্যান্য ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৫ হাজার ৬৪৪ জন। তাঁদের মধ্যে ৪ হাজার ৮২৭ জনই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থক। এ ছাড়া গণপিটুনি ও সংঘবদ্ধ সহিংসতায় ১৮৭ জন, রাজনৈতিক সংঘর্ষে ৭৩ জন এবং কারাগারে ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্রকাশিত মানবাধিকার সহায়তা সংস্থার (এইচআরএসএস) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। দেশের ১৬টি জাতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন, সংস্থাটির নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মানবাধিকার পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

সাংবাদিক নির্যাতন ও রাজনৈতিক গ্রেপ্তার

এইচআরএসএস জানিয়েছে, নয় মাসে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি ও হয়রানির ২৮৮টি ঘটনা ঘটেছে। এতে ২৯৭ সাংবাদিক আহত, ৮৭ জন শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত এবং ৭৭ জন হুমকির শিকার হয়েছেন। আটক হয়েছেন ২০ জন। এ ছাড়া সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৬-এর অধীনে করা ১৯টি মামলায় ৫১ সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে।

২০২৫ সালের পুরো বছরে ৩১৮টি ঘটনায় ৫৩৯ সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই সেই সংখ্যার প্রায় ৯৬ শতাংশে পৌঁছেছে।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় অন্তত ২৭০টি মামলা নথিভুক্ত করেছে সংস্থাটি। এসব মামলায় ৫ হাজার ৮০৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৩২ হাজার ৪৩৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।

রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার ৫ হাজার ৬৪৪ জনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৪ হাজার ৮২৭ জন, বিএনপির ৬০৯ জন এবং জামায়াতে ইসলামীর ১৪৫ জন নেতাকর্মী ও সমর্থক রয়েছেন। মোট রাজনৈতিক গ্রেপ্তারের প্রায় ৮৬ শতাংশই আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট।

রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও গণপিটুনিতে প্রাণহানি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতার ১ হাজার ১৩টি ঘটনায় ৭৩ জন নিহত এবং ৬ হাজার ৪৭৩ জন আহত হয়েছেন।

সংস্থাটির হিসাবে, প্রায় ৯১ শতাংশ ঘটনা বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ অথবা বিএনপির সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ৩৪২টি ঘটনায় ৪০ জন নিহত ও ২ হাজার ৬৩২ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ৩২১টি ঘটনায় ১১ জন নিহত এবং ২ হাজার ১৯০ জন আহত হয়েছেন।

এ ছাড়া বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ৯৩টি সংঘর্ষে নয়জন নিহত হয়েছেন।

একই সময়ে গণপিটুনি ও সংঘবদ্ধ সহিংসতার ৩৯৮টি ঘটনায় অন্তত ১৮৭ জন নিহত এবং ৪০১ জন আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের পুরো বছরে এ ধরনের ২৯২টি ঘটনায় ১৬৮ জন নিহত হয়েছিলেন।

কারাগারে মৃত্যু, নারী ও শিশু নির্যাতন

প্রথম নয় মাসে দেশের কারাগারগুলোতে অন্তত ৯৫ বন্দির মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৪০ জন সাজাপ্রাপ্ত এবং ৫৫ জন বিচারাধীন বন্দি। মৃতদের ২০ জন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কিত পৃথক ঘটনায় আরও ১৭ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে এইচআরএসএস। এর মধ্যে ১২টি মৃত্যু হেফাজতে অথবা কথিত নির্যাতনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অন্তত ২ হাজার ৪০৪ জন। তাঁদের মধ্যে ৬৫৭ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাঁদের ৩৯২ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। ধর্ষণের পর ২৯ নারী ও কন্যাশিশুকে হত্যার তথ্যও নথিভুক্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১ হাজার ৮১০ শিশু। তাদের মধ্যে অন্তত ৪৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও শ্রমিকের মৃত্যু

প্রতিবেদনে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলার তথ্য রয়েছে। এসব ঘটনায় ৬২ জন আহত হয়েছেন। হামলা ও ভাঙচুরের শিকার হয়েছে ২১টি মন্দির, ২০টি প্রতিমা এবং ৪৭টি বাড়ি।

শ্রমিকদের ওপর সহিংসতা ও নির্যাতনের ৫৮২টি ঘটনায় ১৪৫ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৬৩ জন আহত হয়েছেন। অনিরাপদ কর্মপরিবেশে দুর্ঘটনায় আরও ৩৯০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফ-সংশ্লিষ্ট ৪৩টি ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ৩৯ জন আহত হওয়ার তথ্যও তুলে ধরেছে সংস্থাটি।

এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক এজাজুল ইসলাম রাজনৈতিক সহিংসতা, সাংবাদিক নির্যাতন, গণপিটুনি, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তাঁর মতে, মানবাধিকার সুরক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে সরকারসহ সমাজের সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

spot_img
spot_img

অধিক পঠিত

Related Articles