দিনাজপুরে দুই শিশুর মৃত্যুর পর মায়ের মরদেহ উদ্ধার, কারণ খুঁজছে পুলিশ

দুই সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যার পর মায়ের আত্মহত্যার প্রাথমিক ধারণা; পারিবারিক কলহ ও নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তাধীন

দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলায় একই পরিবারের দুই শিশুসন্তান ও তাদের মায়ের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, দুই সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যার পর মা আত্মহত্যা করেছেন। তবে ঘটনার পেছনে পারিবারিক কলহ, নির্যাতন কিংবা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

রোববার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উপজেলার ৬ নম্বর অমরপুর ইউনিয়নের মোস্তফাপুর বালুপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন স্বর্ণা আক্তার (২৩), তাঁর চার বছর বয়সী ছেলে সাফায়েত হোসেন এবং দুই বছর বয়সী মেয়ে রাইসা আক্তার। স্বর্ণা ওই গ্রামের রিকশাচালক শাকিল হোসেনের স্ত্রী।

একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দুই শিশুর মৃত্যুর পরিস্থিতি এবং গৃহবধূর মৃত্যুর পেছনে কোনো ধরনের পারিবারিক নির্যাতন ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

ঘটনার আগে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ

স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে পুলিশ জানিয়েছে, শাকিল হোসেন পেশায় রিকশাচালক। পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে স্ত্রী স্বর্ণা আক্তারের প্রায়ই ঝগড়া হতো।

ঘটনার দিন বিকেলেও তাঁদের মধ্যে বিরোধের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

পরে শাকিলসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা বাজারে যান। এ সময় বাড়িতে দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে স্বর্ণা অবস্থান করছিলেন বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, পরিবারের অন্য সদস্যদের অনুপস্থিতিতে দুই শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর স্বর্ণা আত্মহত্যা করেন।

তবে ঘটনার সময় বাড়িতে অন্য কেউ উপস্থিত ছিলেন কি না কিংবা ঠিক কীভাবে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে তদন্তের আগে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইছে না পুলিশ।

পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে পুলিশ

স্থানীয়দের একটি অংশের ধারণা, দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি ও নির্যাতনের জেরে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।

তবে স্বর্ণা কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে এখনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।

পুলিশ জানিয়েছে, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণের পাশাপাশি ঘটনার আগের পরিস্থিতিও তদন্ত করা হবে।

বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের প্রকৃতি, ঘটনার সময় পরিবারের সদস্যদের অবস্থান এবং অন্য কোনো ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

যা বলছেন স্থানীয় চেয়ারম্যান ও পুলিশ

অমরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন কাজী জানান, সন্ধ্যার দিকে পরিবারের সদস্যরা বাজারে গেলে বাড়িতে থাকা স্বর্ণা তাঁর দুই সন্তানকে হত্যা করেছেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন। পরে স্বর্ণা নিজেও আত্মহত্যা করেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

চিরিরবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদ-উন-নবী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন। ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের পর তা জানানো হবে।

দিনাজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আনোয়ার হোসেন বলেন, নিহত তিনজনের মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হবে। মৃত্যুর কারণ উদ্‌ঘাটনে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষা

পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, দুই শিশুকে হত্যার পর তাঁদের মায়ের আত্মহত্যার সম্ভাবনা সামনে এসেছে। তবে এটি এখনো তদন্তাধীন বিষয়।

ময়নাতদন্তের মাধ্যমে তিনজনের মৃত্যুর কারণ ও পরিস্থিতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

একই সঙ্গে ঘটনার আগে পারিবারিক বিরোধ এবং সম্ভাব্য নির্যাতনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে।

পুলিশের তদন্ত ও ময়নাতদন্তের ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত দুই শিশুর মৃত্যুর জন্য কে দায়ী এবং কী কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

spot_img
spot_img

অধিক পঠিত

Related Articles