বগুড়ায় চুরির অপবাদে সাঁওতাল শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ

সালিশে মারধরের পর ইটভাটার গ্যারেজে মিলল রিপন মুর্মুর মরদেহ; রাতে অ্যাম্বুলেন্সে দিনাজপুরের বাড়িতে পাঠানোর চেষ্টা

বগুড়ায় ঝালাই মেশিন চুরির অপবাদ দিয়ে সালিশে এক সাঁওতাল যুবককে মারধরের পর তাঁর মৃত্যু হয়েছে। নিহত রিপন মুর্মু (২৭) স্থানীয় একটি ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। পরিবারের অভিযোগ, চুরির অভিযোগ তুলে তাঁকে মারধরের পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল। পরে রাতে তাঁর মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে দিনাজপুরের বাড়িতে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বগুড়া সদর উপজেলার চানপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত রিপন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার বেলোয়া বামনপাড়া গ্রামের মোজেস মুর্মুর ছেলে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ৮ থেকে ১০ বছর ধরে রিপন বগুড়া সদরের চানপাড়া এলাকায় আক্তার রহমান ডিউকের মালিকানাধীন একটি ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। ইটভাটার একটি গ্যারেজে থাকতেন তিনি।

চুরির অভিযোগে সালিশ বসিয়ে মারধর

নিহতের বাবা মোজেস মুর্মু অভিযোগ করেন, শুক্রবার সকালে একটি ঝালাই মেশিন চুরির অভিযোগে স্থানীয়ভাবে সালিশ বসানো হয়। ওই সালিশে তাঁর ছেলে রিপনকে মারধর করা হয়।

তিনি জানান, মারধরের পর রাতে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে রিপনের মরদেহ তাঁদের দিনাজপুরের বাড়িতে পাঠানো হয়।

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার পালশা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রবিউল ইসলাম বলেন, রিপনের মৃত্যুর খবর পেয়ে তাঁরা মরদেহ নিয়ে বগুড়ার চানপাড়া এলাকায় যান। সেখানে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, একটি দোকান থেকে ঝালাই মেশিন চুরির অভিযোগে রিপনকে মারধর করা হয়েছিল।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চুরির অভিযোগে রিপনের কাছে ২০ হাজার টাকাও দাবি করা হয়।

শুক্রবার সন্ধ্যায় ইটভাটার যে গ্যারেজে রিপন থাকতেন, সেখানে তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

রবিউল ইসলাম জানান, রিপনের হাত ও পিঠে মারধরের কালো দাগ দেখা গেছে। এসব আঘাতের কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে পরিবারের সদস্যরা সন্দেহ করছেন।

অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ বাড়িতে পাঠানোর চেষ্টা

রিপনের মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে দিনাজপুরের বাড়িতে পাঠানোর ঘটনাও সামনে এসেছে।

অ্যাম্বুলেন্সচালক সিয়াম আহমেদ জানান, শুক্রবার রাত ৯টার দিকে স্থানীয় সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের ছেলে আবু তালহা সেলিম তাঁকে ডেকে পাঠান।

সিয়ামের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে একটি মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে পৌঁছে দিতে বলা হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি মরদেহ নিয়ে রিপনের বাড়িতে যান।

তবে সেখানে পরিবারের কেউ মরদেহ গ্রহণ করেননি। প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর মরদেহ নিয়ে আবার বগুড়ার চানপাড়া এলাকায় ফিরে আসেন তিনি।

পরে শনিবার (১০ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৩টার দিকে পুলিশ তাঁকে মরদেহ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয় বলে জানান অ্যাম্বুলেন্সচালক।

ময়নাতদন্তের পর জানা যাবে মৃত্যুর কারণ

বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহিম আলী জানান, শুক্রবার সকালে ঝালাই মেশিন চুরির অভিযোগে স্থানীয় লোকজন রিপন মুর্মুকে মারধর করেন। পরে রাতে তাঁর থাকার ঘর থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

তিনি বলেন, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

ঘটনায় কাউকে আটক করা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে ওসি জানান, এ বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে বগুড়ায় ইটভাটায় কর্মরত সাঁওতাল শ্রমিক রিপন মুর্মুর মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর পরিবার বিচার দাবি করেছে। চুরির অভিযোগের সত্যতা, সালিশে মারধরের সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন এবং মারধরের পর কীভাবে তাঁর মৃত্যু হলো, এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

spot_img
spot_img

অধিক পঠিত

Related Articles