বাবাকে লোকেশন পাঠিয়েও বাঁচতে পারেনি তাজমিন

কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফিরে গভীর রাতে বাবাকে নিজের অবস্থান জানিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছিল সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন। কিন্তু বাবা তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে মেয়ের পাঠানো বার্তা ও অবস্থান দেখে সেখানে পৌঁছে জানতে পারেন, ধানখেত থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে তার মেয়ের মরদেহ। কুমিল্লার লালমাইয়ে স্কুলছাত্রী তাজমিন হত্যাকাণ্ডের তদন্তে উঠে এসেছে এমন হৃদয়বিদারক তথ্য।

এ ঘটনায় সন্দেহভাজন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমনকে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকালে চট্টগ্রাম নগরী থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত তাজমিনের মরদেহের কাছ থেকে উদ্ধার করা অটোরিকশাটির সূত্র ধরে তাকে শনাক্ত করা হয়।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালিয়ে সুমনকে গ্রেপ্তার করে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা ও ঘটনার কারণ জানতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

বান্ধবীর বাড়ি যাওয়ার কথা বলে বের হয়েছিল তাজমিন

নিহত জান্নাতুল তাজমিন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা আবদুল আলীম একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাজমিন নগরীর রেসকোর্স এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকত। তাদের গ্রামের বাড়ি যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়া এলাকায়।

পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাড়ি যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় তাজমিন। পরে জানা যায়, সে কক্সবাজারে গিয়েছিল।

গত বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকেলে কক্সবাজার থেকে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয় সে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় নূরজাহান হোটেলের কাছে বাস থেকে নামে।

এরপর কীভাবে সে লালমাইয়ের জগতপুর এলাকায় পৌঁছায় এবং কার সঙ্গে সেখানে গিয়েছিল, তা জানার চেষ্টা করছে পুলিশ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পদুয়ার বাজার থেকে ঘটনাস্থল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিশেষ করে বাস থেকে নামার পর তাজমিনের চলাচল এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

রাত পৌনে ২টায় বাবাকে পাঠায় অবস্থান

তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম জানান, বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাত পৌনে ২টার দিকে তার হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা পাঠিয়েছিল মেয়ে। বার্তার সঙ্গে নিজের অবস্থানও পাঠিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছিল।

কিন্তু ওই সময় তিনি ঘুমিয়ে থাকায় বার্তাটি দেখতে পাননি। সকালে ঘুম থেকে উঠে মেয়ের পাঠানো অবস্থান দেখে সেখানে যান।

আবদুল আলীম জানান, মেয়ের পাঠানো অবস্থান অনুযায়ী ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি দেখতে পান, পুলিশ তার মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করছে।

তাজমিনের মা কেয়া খাতুনও মেয়ের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের বর্ণনা দিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়ের সঙ্গে শেষবার কথা বলার সময় তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে এবং তাকে নিয়ে যেতে বলেছিল। মা ওই বান্ধবী ও তার পরিবারের পরিচয় জানতে চাইলেও তাজমিন বিস্তারিত জানায়নি।

ধানখেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন

বৃহস্পতিবার সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেতে গলায় গামছা প্যাঁচানো অবস্থায় তাজমিনের মরদেহ দেখতে পান স্থানীয় বাসিন্দারা।

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। কাছেই কাচিকাটা-হরিশ্চর বাজার সড়কের পাশে মনুমুড়া এলাকায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। মরদেহ থেকে অটোরিকশাটির দূরত্ব ছিল প্রায় ৫০ গজ। ঘটনাস্থলের কাছ থেকে একটি ব্যাগও উদ্ধার করা হয়।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, নিহত কিশোরীর গলায় একটি গামছা প্যাঁচানো ছিল। ঘটনাস্থলের অন্তত চার-পাঁচটি ধানখেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে।

এসব আলামত দেখে তদন্তকারীদের ধারণা, হামলাকারীদের হাত থেকে বাঁচতে তাজমিন পালানোর চেষ্টা করেছিল। তবে হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ ঘটনা জানতে আরও তদন্ত প্রয়োজন।

অটোরিকশার সূত্র ধরে সুমন গ্রেপ্তার

মরদেহের কাছ থেকে উদ্ধার করা অটোরিকশাটি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে। পুলিশ প্রথমে গাড়িটির মালিক আবুল হাশেমকে শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেয়।

পরে তদন্তে জানা যায়, ঘটনার সময় অটোরিকশাটি চালাচ্ছিলেন সুমন নামে এক ব্যক্তি। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তিনি কুমিল্লার পদুয়ার বাজার ও আশপাশের এলাকায় মূলত রাতে অটোরিকশা চালাতেন।

সুমনকে শনাক্ত করার পর তার অবস্থান জানতে অনুসন্ধান শুরু করে পুলিশ। এ সময় তার কয়েকজন স্বজনকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়।

শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামে তার ভাইয়ের বাড়ি থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার সুমনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত একটি আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে। অটোরিকশা, মোবাইল ফোন ও সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজের সূত্র ধরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহ জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।

তবে সুমন সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন কি না এবং এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি না, সে বিষয়ে তদন্ত শেষ হয়নি।

যশোরে দাফন, বিচার চান স্বজনেরা

বৃহস্পতিবার মরদেহ উদ্ধারের পর তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

ময়নাতদন্ত শেষে তাজমিনের মরদেহ যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়া গ্রামে নেওয়া হয়। শুক্রবার সকাল ১০টায় জানাজা শেষে দাদার কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।

মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন আবদুল আলীম ও তার পরিবারের সদস্যরা।

পুলিশ জানিয়েছে, তাজমিনের কক্সবাজার সফর, কুমিল্লায় ফেরার পর তার চলাচল, শেষবার বাবাকে পাঠানো অবস্থান এবং উদ্ধার করা অটোরিকশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত চলছে।

spot_img
spot_img

অধিক পঠিত

Related Articles