পাবনার ভাঙ্গুড়ায় একসময় সিনেমাপ্রেমীদের পরিচিত ঠিকানা ছিল ‘মৌচাক’ সিনেমা হল। ঈদ-পূজায় দর্শকের উপচেপড়া ভিড়, দিনে তিন-চারটি প্রদর্শনী আর করতালিতে মুখর প্রেক্ষাগৃহ—সবই এখন স্মৃতি। উপজেলার সর্বশেষ সিনেমা হলটির ভবনও ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে ‘মৌচাক টাওয়ার’ নামে বহুতল ভবন।
এর মধ্য দিয়ে ভাঙ্গুড়ায় সিনেমা হলকেন্দ্রিক বিনোদনের দীর্ঘ একটি অধ্যায়ের অবসান হলো।
একসময় উপজেলায় মৌচাক, রংধনু ও পাইলট নামে তিনটি সিনেমা হল ছিল। চলচ্চিত্রের মন্দা, স্যাটেলাইট টেলিভিশনের বিস্তার এবং বিনোদনের মাধ্যম ও প্রযুক্তিতে পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রেক্ষাগৃহে দর্শক কমতে থাকে। একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় পাইলট ও রংধনু। এর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর পর বন্ধ হয়ে যায় মৌচাকও।
আশি-নব্বইয়ের দশকে দিনে চলত তিন-চারটি প্রদর্শনী
স্থানীয়দের স্মৃতিতে মৌচাকের সবচেয়ে জমজমাট সময় আশি ও নব্বইয়ের দশক। তখন প্রতিদিন তিন থেকে চারটি করে সিনেমার প্রদর্শনী চলত। ঈদ, পূজা ও বিভিন্ন উৎসবের দিনে দর্শকের ভিড়ে সরগরম থাকত পুরো এলাকা।
বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে সিনেমা দেখতে আসতেন। কোনো কোনো জনপ্রিয় সিনেমার চাহিদা এতটাই ছিল যে টানা এক মাস পর্যন্ত প্রদর্শন করা হতো।
সময় বদলানোর সঙ্গে সেই দৃশ্যও পাল্টাতে থাকে। দর্শক কমে যাওয়ায় নিয়মিত সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন লোকসানের কারণে শেষ দিকে শুধু বিশেষ দিবসে হলটি চালু রাখা হতো।
হল পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্যমতে, মৌচাকে সর্বশেষ প্রদর্শিত সিনেমা ছিল আজমান রুশো পরিচালিত ‘রকস্টার’। এরপর পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় প্রেক্ষাগৃহটি।
তিন যুগের বেশি সময় প্রচার করেছেন ‘ফাটাই মামা’
মৌচাকের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আব্বাস আলীর নামও। স্থানীয়ভাবে ‘ফাটাই মামা’ নামে পরিচিত আব্বাস আলী তিন যুগের বেশি সময় সিনেমা হলটির প্রচারক হিসেবে কাজ করেছেন।
সিনেমার প্রচারণা থেকে শুরু করে দর্শকের ভিড়—হলের ব্যস্ত সময়ের অনেক স্মৃতির সাক্ষী তিনি।
আব্বাস আলী বলেন, দর্শকের ভিড়ে হল প্রাঙ্গণ সরগরম থাকত। কর্মচারীরাও সারা বছর বোনাসের অপেক্ষায় থাকতেন। দর্শকের করতালিতে মুখরিত সেই মৌচাক সিনেমা হল এখন শুধুই স্মৃতি।
‘শুধু বিনোদনকেন্দ্র নয়, ছিল কালের সাক্ষী’
গীতিকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নুরুজ্জামান সবুজ বলেন, মৌচাক শুধু একটি বিনোদনকেন্দ্র ছিল না, এটি ছিল কালের সাক্ষী।
নতুন ভবন নির্মাণের মধ্য দিয়ে সিনেমা হলটির অস্তিত্ব হারিয়ে গেলেও মৌচাকের সঙ্গে রংধনু ও পাইলট সিনেমা হলও দীর্ঘদিন স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে বলে মনে করেন তিনি।
যে জায়গায় একসময় বড় পর্দায় সিনেমা দেখতে ভিড় করতেন শত শত দর্শক, সেখানে এখন উঠছে বহুতল ভবন। তবে নতুন ভবনের নামের মধ্যেই থেকে যাচ্ছে পুরোনো প্রেক্ষাগৃহের স্মৃতি—‘মৌচাক টাওয়ার’।



