যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই অঙ্গরাজ্যের মাউই দ্বীপের কৃষকেরা একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে বড় ধরনের ফসলহানির মুখে পড়েছেন। মার্চের প্রবল বৃষ্টি ও বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই আগস্টে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় লালা। এখন নতুন করে ঘূর্ণিঝড় লোয়েল ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় কারিনার আশঙ্কায় উদ্বেগে রয়েছেন তাঁরা।
মাউইয়ের বিভিন্ন খামারে ফসলের পাশাপাশি অবকাঠামোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোনো কোনো খামারে ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন কমেছে বা ফসল নষ্ট হয়েছে।
একটি খামারেই আড়াই লাখ ডলারের ক্ষতি
কুলা এলাকার ৪৬ একরের ওকোয়া ফার্মসে মার্চের ‘কোনা লো’ ঝড়ে প্রায় আড়াই লাখ ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন খামারটির মালিক রায়ান ইয়ারহার্ট।
প্রবল বৃষ্টিতে নতুন লাগানো ফসল নষ্ট হয়, মাটির ক্ষয় হয় এবং ফসল মোড়কজাত করার স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হরিণ ঠেকানোর বেড়াও ভেঙে যায়। খামারের এক শ্রমিকের বাড়ির চিলেকোঠায় পানি ঢুকে ছাদ ধসে পড়ে।
ঝড়ের পর টিকে থাকা ফসলের উৎপাদন প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে যায়। পর্যাপ্ত ফসল না থাকায় প্রায় তিন মাস পাইকারি বিক্রি বন্ধ রাখতে হয় খামারটিকে।
কৃষকেরা নতুন করে চাষাবাদ শুরু করে ফসল তুলতে শুরু করেছিলেন। এর মধ্যেই আগস্টে ঘূর্ণিঝড় লালা আঘাত হানে।
শসায় রোগ, আখে কমেছে মিষ্টতা
ঘূর্ণিঝড় লালার ক্ষতির পুরো চিত্র শুরুতে বুঝতে পারেননি ইয়ারহার্ট। কয়েক সপ্তাহ পর ফসলের উৎপাদন কমতে শুরু করলে ক্ষতির মাত্রা স্পষ্ট হয়।
স্ট্রবেরি গাছের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রবল বাতাসে কেল ও চার্ড গাছ মাটির দিকে হেলে গেছে। বৃষ্টি ও বাতাসে ছড়িয়ে পড়া রোগের জীবাণুতে আক্রান্ত হয়েছে শসা।
ক্ষতির প্রভাব পড়েছে আখেও। ইয়ারহার্ট জানিয়েছেন, টিকে থাকা আখ থেকে পাওয়া রস আগের মতো মিষ্টি নয়। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে ফেটে যাওয়া গাজর বিক্রির অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে ওকোয়া ফার্মসে প্রত্যাশিত উৎপাদনের মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ পাওয়া যাচ্ছে। অন্য দ্বীপের বড় পরিবেশকদের কাছ থেকে আসা পাইকারি ক্রয়াদেশও ৫০ শতাংশ বা তার বেশি কমে গেছে।
আরেক খামারের ৮০ শতাংশ ফসল নষ্ট
মাউইয়ের ওলিন্ডা এলাকার দুই একরের লাপাউ ফার্মেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। ছোট এই খামারটিতে বছরে এক লাখ পাউন্ডের বেশি কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়।
মার্চের অতিবৃষ্টিতে মাটি অতিরিক্ত পানিতে সিক্ত হয়ে পড়ে। আর্দ্র পরিবেশে শসা ও টমেটোয় দ্রুত রোগ ছড়িয়ে পড়ে। কৃষকেরা বিকল্প ফসল চাষ শুরু করলেও আগস্টের ঘূর্ণিঝড় লালা সেগুলোরও বড় অংশ নষ্ট করে দেয়।
খোলা মাঠে থাকা প্রায় ৮০ শতাংশ ফসল ধ্বংস হয়েছে। কাটার উপযোগী হয়ে আসা ভুট্টাগাছ বাতাসে মাটির দিকে হেলে পড়ে। শিমের একটি পুরো আবাদও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
খামারের মালিক লরেন মারশঁ বলেছেন, প্রায় আট বছরের কৃষিকাজের অভিজ্ঞতায় বাতাসে এত বেশি ফসলের ক্ষতি তাঁরা আগে দেখেননি।
ফুলের খামারে ৮০ শতাংশ ফসলহানি
পূর্ব মাউইয়ের ২০ একরের হানা ট্রপিক্যালস ফুলের খামারেও মার্চের দুর্যোগে প্রায় ৮০ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়। নার্সারির ছাদ উড়ে যায় এবং গুদামে পানি ঢোকে।
প্রায় ৪০ ফুট উঁচু আটটি বড় ফাইকাস গাছ উপড়ে পড়ে। এতে টেলিফোন, ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি খামার ব্যবস্থাপকের বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গাছগুলো সরাতেই খামারটির প্রায় ৫৩ হাজার ডলার ব্যয় হয়েছে।
যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুই সপ্তাহ ব্যবসা বন্ধ রাখতে হয়।
মাতৃদিবস উপলক্ষে সাধারণত খামারটি প্রায় ২৫০ বাক্স ফুল বিক্রি করে। কিন্তু এ বছর উৎপাদন কমে যাওয়ায় মাত্র ৫০ বাক্স ফুল বিক্রি করতে পেরেছে।
মার্চের ক্ষতি কাটিয়ে খামারের প্রায় অর্ধেক জমি পরিষ্কার ও পুনরায় চাষের আওতায় আনার পর ঘূর্ণিঝড় লালা আবার নতুন লাগানো ফুল নষ্ট করে দেয়।
কৃষকদের সহায়তায় ১০ লাখ ডলারের বেশি সংগ্রহ
হাওয়াই ফারমার্স ইউনিয়ন ফাউন্ডেশন মার্চ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ১০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ করেছে।
এর মধ্যে সাত লাখ ডলারের বেশি মাউই, মলোকাই, লানাই, হাওয়াই, কাউয়াই ও ওআহু দ্বীপের ১৬২ জন কৃষি উৎপাদককে দেওয়া হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ অনুযায়ী এক হাজার থেকে ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হচ্ছে।
শুধু ঘূর্ণিঝড় লালায় হাওয়াইয়ের ৭৯ ধরনের খামারে ৩০ লাখ ডলারের বেশি ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে বলে কৃষক সংগঠনটি জানিয়েছে।
দ্রুত ফলনশীল ফসলে ঝুঁকছেন কৃষকেরা
ক্ষতি সামলে উৎপাদন ধরে রাখতে লাপাউ ফার্ম এখন দ্রুত ফলনশীল ও বেশি বৃষ্টি সহ্য করতে পারে এমন ফসল চাষ করছে। এর মধ্যে রয়েছে আরুগুলা, ঢ্যাঁড়স, শালগম ও বিভিন্ন মূলজাতীয় ফসল। এগুলোর কিছু ৩০ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে সংগ্রহ করা সম্ভব।
উৎপাদন কমে যাওয়ায় রেস্তোরাঁ ও মুদি দোকানে সপ্তাহে দুইবারের পরিবর্তে একবার পণ্য সরবরাহ করছে খামারটি।
ওকোয়া ফার্মসও পুনরায় ফসল লাগাচ্ছে। তবে খামারের ক্ষতিগ্রস্ত অস্থায়ী স্থাপনা মেরামত করা হবে, নাকি দুর্যোগ সহনশীল স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করা হবে—অর্থের অভাবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যায় পড়েছেন মালিকেরা।
সামনে আবার দুর্যোগের আশঙ্কা
কৃষকেরা যখন আগের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন, তখন হাওয়াইয়ের দিকে এগিয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় লোয়েল নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। মাউইয়ের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাসের পাশাপাশি বন্যার সতর্কতাও জারি করা হয়েছে।
একের পর এক দুর্যোগের কারণে অনেক কৃষক সরকারি সহায়তার জন্য আবেদন করছেন। তবে খামার পরিচালনা, ফসল পুনরায় লাগানো ও ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতের পাশাপাশি সহায়তার আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাও তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।



