বিশ্বে খাদ্যের দাম প্রায় ৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ

যুদ্ধ, প্রতিকূল আবহাওয়া ও সরবরাহ সংকটের প্রভাব; শস্য উৎপাদনের পূর্বাভাসও কমাল এফএও

বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম আবারও দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। প্রতিকূল আবহাওয়া, কৃষিপণ্যের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ, কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক পরিবহনে বিঘ্ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে আগস্টে বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য ২০২২ সালের শেষ দিকের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রকাশিত মাসিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এফএওর খাদ্য মূল্যসূচক আগস্টে গড়ে ১৩৩ দশমিক ৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ের সংশোধিত ১৩০ দশমিক ৮ পয়েন্টের তুলনায় এটি ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। এক বছর আগের তুলনায় সূচকটি বেড়েছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ।

আগস্টের এই অবস্থান ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ। তবে রাশিয়ার ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর ২০২২ সালের মার্চে খাদ্যমূল্য যে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল, বর্তমান সূচক এখনো তার প্রায় ১৭ শতাংশ নিচে।

একসঙ্গে বেড়েছে প্রধান সব খাদ্যপণ্যের দাম

এফএওর সূচকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্য হওয়া প্রধান খাদ্যপণ্যের দামের মাসিক পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়। আগস্টে সংস্থাটির পাঁচটি প্রধান খাদ্যশ্রেণি—শস্য, উদ্ভিজ্জ তেল, চিনি, মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য—সবকটির মূল্যসূচক বেড়েছে।

বিশেষ করে শস্য ও চিনির বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ছিল উল্লেখযোগ্য।

শস্যের মূল্যসূচক আগের মাসের তুলনায় ২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ২০২৪ সালের মে মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিশ্ববাজারে গমের দাম এক মাসে ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় গম এখন ১৫ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

অন্যদিকে উদ্ভিজ্জ তেলের মূল্যসূচক আগস্টে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ২০২২ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

চিনির দামে বড় লাফ

আগস্টে সবচেয়ে বড় মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে চিনিতে। এফএওর চিনি মূল্যসূচক এক মাসেই ১১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম ২০২৫ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।

বিশ্বের অন্যতম প্রধান চিনি উৎপাদক ব্রাজিলের মধ্য-দক্ষিণাঞ্চলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি ইউরোপ ও এশিয়ার প্রতিকূল আবহাওয়া বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

ইউরোপে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ ও খরার কারণে ভুট্টা এবং সুগার বিটের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে পশুপালন খাতের উৎপাদনও প্রতিকূল আবহাওয়ার চাপে পড়েছে।

এশিয়ায় সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে পাম তেল ও চিনির উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওপর চাপ তৈরি করছে।

কৃষ্ণসাগরের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শস্যবাজারে চাপ

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য পরিবহনে নতুন করে বিঘ্ন দেখা দেওয়াও আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে হামলা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বের দুই গুরুত্বপূর্ণ শস্য রপ্তানিকারক রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে পণ্য পরিবহন সীমিত হয়ে পড়েছে।

বিশেষ করে গমের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কৃষ্ণসাগরের রপ্তানি অবকাঠামো ও পরিবহন ব্যবস্থায় অব্যাহত বিঘ্নকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এফএও।

এর সঙ্গে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে উৎপাদনের পূর্বাভাস কমে যাওয়া এবং মার্কিন ডলারের দুর্বলতাও গমের আন্তর্জাতিক মূল্য বাড়িয়েছে।

ইরান যুদ্ধের প্রভাব সারের বাজারে

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও খাদ্য উৎপাদনের ব্যয় ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে কৃষিকাজে ব্যবহৃত সারের আন্তর্জাতিক সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় কৃষি উপকরণের পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

সার সরবরাহ দীর্ঘ সময় বাধাগ্রস্ত হলে বিভিন্ন দেশে কৃষি উৎপাদনের খরচ বাড়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ফসল উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

‘খাদ্যবাজারে আবার ঝুঁকির মূল্য যোগ হচ্ছে’

এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো আগস্টের মূল্যবৃদ্ধিকে বিশ্ব খাদ্যবাজারের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন।

তার মতে, জলবায়ুজনিত ধাক্কা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন একই সময়ে খাদ্য সরবরাহের প্রত্যাশাকে সংকুচিত করছে।

এই পরিস্থিতি বিশ্ব খাদ্যবাজারে আবারও ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’ বা ঝুঁকিজনিত অতিরিক্ত মূল্য ফিরিয়ে আনছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

এফএও বলছে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা, উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সারসহ কৃষি উপকরণের নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করা বৈশ্বিক খাদ্যমূল্যের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কমানো হলো বিশ্বে শস্য উৎপাদনের পূর্বাভাস

খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বৈশ্বিক শস্য উৎপাদনের পূর্বাভাসেও নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে এফএও।

আলাদা প্রতিবেদনে সংস্থাটি ২০২৬ সালের বৈশ্বিক শস্য উৎপাদনের পূর্বাভাস জুলাইয়ের আগের হিসাব থেকে ৩৪ লাখ টন কমিয়েছে।

নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বে মোট শস্য উৎপাদন হতে পারে ২৯৮ কোটি টন। এই পরিমাণ ২০২৫ সালের তুলনায় ২ শতাংশ কম।

বার্ষিক হিসাবে এটি ২০১৮ সালের পর বৈশ্বিক শস্য উৎপাদনে সবচেয়ে বড় পতন হতে যাচ্ছে। তবে উৎপাদন কমলেও ২০২৬ সালের সম্ভাব্য মোট শস্য উৎপাদন ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ থাকবে।

শস্যের মজুদের পূর্বাভাসও কমেছে

২০২৬-২৭ মৌসুম শেষে বিশ্বে শস্যের মজুদের পূর্বাভাসও কমিয়েছে এফএও।

নতুন হিসাবে বৈশ্বিক শস্য মজুদ দাঁড়াতে পারে ৯৪ কোটি ৭২ লাখ টনে। আগের পূর্বাভাসের তুলনায় এটি ১ দশমিক ১ শতাংশ কম এবং গত মৌসুমের তুলনায় মাত্র সামান্য বেশি।

বিশেষ করে মোটা দানার শস্যের মজুদ কমে যাওয়ার পূর্বাভাস সার্বিক হিসাবকে নিচের দিকে টেনে এনেছে।

অন্যদিকে গমের মজুদের পূর্বাভাস কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। কৃষ্ণসাগরে জাহাজ চলাচল ও রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় রাশিয়া ও ইউক্রেনে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি গম মজুদ থেকে যেতে পারে বলে ধারণা করছে এফএও।

বিশ্ব খাদ্যবাজারের সর্বশেষ পরিস্থিতি এমন সময়ে উদ্বেগ তৈরি করছে, যখন যুদ্ধ, আবহাওয়ার চরমভাবাপন্নতা এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ঝুঁকি একই সঙ্গে বাড়ছে। এসব পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে খাদ্য আমদানিনির্ভর দেশগুলোর আমদানি ব্যয় এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে খাদ্যের দামের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

spot_img
spot_img

অধিক পঠিত

Related Articles