প্রতি ১০০ টাকা ঋণের ৩৩ টাকাই খেলাপি, চাপে দেশের অর্থনীতি

খেলাপি ঋণ ছাড়িয়েছে ৬ লাখ কোটি টাকা; ব্যাংকের মুনাফা ও ঋণ সক্ষমতার পাশাপাশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতিতেও প্রভাবের শঙ্কা

দেশের ব্যাংক খাতে প্রতি ১০০ টাকা ঋণের প্রায় ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি। বিপুল অঙ্কের এই অনাদায়ী ঋণ শুধু ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতাকেই দুর্বল করছে না, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, ঋণের সুদহার, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধার পাশাপাশি ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই এখন খেলাপি।

মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে আরও ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে।

প্রতি ১০০ টাকা ঋণের ৩৩ টাকাই খেলাপি

জুন শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি হয়ে পড়ায় ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকা ঋণের প্রায় ৩৩ টাকাই এখন অনাদায়ী।

খেলাপি ঋণের এমন উচ্চহার ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে। কারণ কোনো ঋণ খেলাপি হলে তার বিপরীতে ব্যাংককে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রভিশন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়।

ফলে ব্যাংকের অর্থের একটি অংশ আটকে যায় এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে আসে। একই সঙ্গে মুনাফা ও মূলধনের ওপরও চাপ বাড়ে।

মুনাফা ও লভ্যাংশেও প্রভাব

উচ্চ খেলাপি ঋণের প্রভাব ব্যাংকগুলোর মুনাফা ও শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশেও পড়ছে।

২০২৫ সালে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১৬টি লভ্যাংশ দিতে পেরেছে। ২০২৬ সালের জন্য লভ্যাংশ দেওয়ার নিয়ম আরও কঠোর করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের বেশি হলে এবং পরিশোধিত মূলধন দুই হাজার কোটি টাকার নিচে থাকলে সেই ব্যাংক নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না।

এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুর্বল আর্থিক অবস্থায় থাকা ব্যাংকগুলো থেকে অর্থ বেরিয়ে যাওয়া ঠেকিয়ে মূলধনভিত্তি শক্তিশালী রাখার চেষ্টা করছে।

বিনিয়োগেও তৈরি হচ্ছে বাধা

খেলাপি ঋণের প্রভাব ব্যাংকের হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বিপুল পরিমাণ অর্থ অনাদায়ী হয়ে গেলে ব্যাংকের নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যায়।

এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ব্যবসা ও শিল্প খাতে। উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন না পেলে নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয়।

অন্যদিকে ব্যাংকের অর্থায়ন ব্যয় এবং ঝুঁকি বেড়ে গেলে ঋণের সুদের হারও উঁচু থাকতে পারে। উচ্চ সুদে অর্থ নিয়ে নতুন শিল্প স্থাপন বা বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণ অনেক উদ্যোক্তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত উৎপাদন ও কর্মসংস্থানেও পড়ার আশঙ্কা থাকে।

বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও প্রভাবের আশঙ্কা

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এর আগে বলেছেন, খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকিং খাতের সমস্যা নয়; এর প্রভাব সামষ্টিক অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ে।

তার মতে, খেলাপি ঋণ বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে এবং দেশীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের ঝুঁকি বাড়ে।

টাকার অবমূল্যায়ন রপ্তানিকারকদের কিছু ক্ষেত্রে সুবিধা দিলেও বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে এর বিপরীত প্রভাবও রয়েছে। কাঁচামাল, জ্বালানি ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির খরচ বেড়ে গেলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্য ও মূল্যস্ফীতিতে পড়তে পারে।

পুনঃতফসিলেও মিলছে না স্থায়ী সমাধান

খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের বিভিন্ন সুযোগ দিয়েছে।

বন্ধ বা সমস্যায় থাকা কারখানা সচল করা এবং ঋণ পরিশোধে সমস্যায় থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দিতে বিশেষ ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

এসব পদক্ষেপের ফলে কোনো কোনো সময় হিসাবের খাতায় খেলাপি ঋণ সাময়িকভাবে কমেছে। তবে পরবর্তী সময়ে পুনঃতফসিল করা ঋণের একটি অংশ আবার খেলাপি হয়ে যাওয়ায় সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল, যা ছিল মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। পরে বছরের শেষ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে তা আবার ছয় লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেছে।

দীর্ঘদিনের সমস্যায় ব্যাংক খাত

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও গত কয়েক বছরে এর প্রকৃত পরিমাণ দ্রুত বেড়ে সামনে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা, যা তখন মোট ঋণের প্রায় ৯ শতাংশ ছিল।

এরপর ঋণ শ্রেণিকরণের আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ, দুর্বল ঋণের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ এবং ব্যাংকের সম্পদের মান নতুনভাবে যাচাইয়ের কারণে খেলাপি ঋণের স্বীকৃত পরিমাণ দ্রুত বাড়ে।

ফলে বর্তমান অঙ্কের পুরো বৃদ্ধিকে শুধু নতুন করে ছয় লাখ কোটি টাকা ঋণ অনাদায়ী হওয়ার ফল হিসেবে দেখা যথার্থ নয়। আগে বিভিন্নভাবে পুনঃতফসিল, নবায়ন বা অন্য শ্রেণিতে থাকা দুর্বল ঋণের একটি অংশও নতুন নিয়মে খেলাপি হিসেবে দৃশ্যমান হয়েছে।

সুশাসন ছাড়া সমাধান কঠিন

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শুধু ঋণ পুনঃতফসিল করে খেলাপি ঋণের সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহকের সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই, রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ বন্ধ, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে অর্থঋণ আদালতে আটকে থাকা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি এবং ঋণের বিপরীতে থাকা জামানত থেকে অর্থ আদায়ের ব্যবস্থাকেও কার্যকর করতে হবে।

ব্যাংক খাতের বিপুল অর্থ দীর্ঘ সময় অনাদায়ী থাকলে এর খেসারত শুধু ব্যাংক বা আমানতকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ঋণের প্রবাহ কমে যাওয়া, বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়া, কর্মসংস্থান সৃষ্টি কমে আসা এবং আর্থিক খাতের প্রতি আস্থার সংকটের মাধ্যমে এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তাই ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়ানো খেলাপি ঋণ এখন শুধু ব্যাংক খাতের সমস্যা নয়; বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও এটি অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

spot_img
spot_img

অধিক পঠিত

Related Articles