আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস ও কয়লার বর্তমান উচ্চমূল্য অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি ব্যয় গত বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ ২৮০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। এতে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি এবং টাকার বিনিময় হারের ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের নতুন বিশ্লেষণে এ আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি ব্যয় ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে। বাড়তি এই ব্যয় দেশের মোট বাণিজ্য ঘাটতির প্রায় ১০ শতাংশের সমান।
আমদানি সক্ষমতাও কমতে পারে
জেডসিএর হিসাব অনুযায়ী, সংকটের আগে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে প্রায় ৫ দশমিক ৭ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব ছিল।
কিন্তু তেল, গ্যাস ও কয়লার বর্তমান গড় দাম বছরের বাকি সময়েও বহাল থাকলে এই আমদানি সক্ষমতা ৫ দশমিক ২ মাসে নেমে আসতে পারে।
সংস্থাটি বলছে, অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় শুধু বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়াবে না, টাকার বিনিময় হার দুর্বল করা এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি করবে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর ঋণের সুদহার আরও বাড়ানোর চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
এলএনজি আমদানি কমেছে ১৩ শতাংশ
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে। জুলাইয়ে বাংলাদেশ প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার টন এলএনজি আমদানি করলেও আগস্টে তা নেমে আসে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টনে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে আমদানি প্রায় ৮৩ শতাংশ কমেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বাধা এই সংকটের প্রধান কারণগুলোর একটি।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হরমুজ প্রণালি হয়ে এসেছিল। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশ সরাসরি সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়ে।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতেও মিলছে না নিশ্চয়তা
বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে কাতার এনার্জি, ওমানের ওকিউ ট্রেডিং এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জির কাছ থেকে এলএনজি সংগ্রহ করে।
কিন্তু চলমান সংকটের মধ্যে এই তিন সরবরাহকারীই ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে বিশেষ পরিস্থিতিতে চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সরবরাহ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
কাতার এনার্জি ইতোমধ্যে জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশকে নির্ধারিত ৪০টি এলএনজি কার্গোর পরিবর্তে প্রায় ২০টি কার্গো সরবরাহ করতে হতে পারে।
এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকলেও বাংলাদেশ নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় এলএনজি পাবে—এমন নিশ্চয়তা থাকছে না।
৬৪ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন গ্যাসনির্ভর
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় গ্যাসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬৪ শতাংশই গ্যাসনির্ভর ছিল।
ফলে এলএনজি সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে দ্রুত প্রভাব পড়ে।
গত ১১ আগস্ট দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ ঘাটতি ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াটে পৌঁছায়, যা ওই সময়ের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবরও পাওয়া গেছে। কিছু গ্রামীণ এলাকায় প্রতিদিন আট থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার তথ্য উঠে এসেছে জেডসিএর বিশ্লেষণে।
সার কারখানা ও শিল্পেও চাপ
গ্যাসের সংকট শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনে নয়, শিল্প ও কৃষি খাতেও প্রভাব ফেলছে।
দেশের সাতটি বড় সার কারখানার মধ্যে ছয়টি পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় পুরোপুরি বন্ধ অথবা সীমিত সক্ষমতায় উৎপাদন করছে বলে জেডসিএ জানিয়েছে।
এতে দেশে সার উৎপাদন কমে গিয়ে আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। ফলে কৃষি উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধির আশঙ্কাও রয়েছে।
একইভাবে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পেও গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের প্রভাব পড়ছে। সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ের কয়েকটি শিল্পকারখানায় উৎপাদন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের বড় দুর্বলতা হিসেবে আমদানিনির্ভরতাকে চিহ্নিত করেছে জেডসিএ।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৪৬ শতাংশ আমদানি করা হয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার সঙ্গে যুক্ত জ্বালানির প্রায় ৬৫ শতাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমদানিনির্ভর ছিল।
দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমতে থাকায় গত কয়েক বছরে এলএনজির ওপর নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৮ দশমিক ৩ মিলিয়ন টন বার্ষিক এলএনজি আমদানি সক্ষমতা রয়েছে। এর সঙ্গে আরও প্রায় ১১ দশমিক ৩ মিলিয়ন টন সক্ষমতার নতুন অবকাঠামো নির্মাণ বা পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে বলে জেডসিএ জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১১৭ এলএনজি কার্গোর চুক্তি
জ্বালানি সরবরাহে বৈচিত্র্য আনতে বাংলাদেশ ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১১৭টি এলএনজি কার্গো কেনার একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে।
সরকার একই সঙ্গে স্পট মার্কেটসহ যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও ওমানের সরবরাহকারীদের কাছ থেকেও অতিরিক্ত কার্গো সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। ভারত থেকেও অতিরিক্ত ডিজেল চাওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন সরবরাহকারী যোগ করলেও আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামা ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অস্থিরতার ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি মুক্ত হওয়া সম্ভব হবে না।
২০৩০ সালে এলএনজি আমদানি ব্যয় ১৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত যেতে পারে
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের বাংলাদেশবিষয়ক জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলমের হিসাবে, পরিকল্পিত নতুন এলএনজি টার্মিনালগুলো চালু হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি ৭০০ বিলিয়ন ঘনফুট ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারদরের ওপর নির্ভর করে তখন বছরে শুধু এলএনজি কিনতেই প্রায় ৮৫০ কোটি থেকে ১ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।
তার মতে, এত বড় পরিমাণ আমদানিনির্ভরতা বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়াবে এবং বাংলাদেশের শিল্পকারখানার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
বাড়তি ৩৫ হাজার কোটি টাকায় ৮ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ
জেডসিএর বিশ্লেষণে জীবাশ্ম জ্বালানিতে বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনার একটি তুলনাও তুলে ধরা হয়েছে।
সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ সালে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে যে অতিরিক্ত ২৮০ কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে, সেই অর্থ দিয়ে বাংলাদেশে প্রায় ৮ গিগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন সম্ভব।
বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩২ গিগাওয়াট। ফলে ৮ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হলে বর্তমান সক্ষমতার আরও প্রায় ২৫ শতাংশ সমপরিমাণ নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হতে পারে।
প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতে বছরে বড় সাশ্রয়
আইইইএফএর হিসাবে, ১ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করলে বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলারের আমদানি করা জ্বালানি ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব।
কারখানা, বাণিজ্যিক ভবন ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি গ্যাস ও এলএনজির ব্যবহারও কমানো সম্ভব বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে এখনও পিছিয়ে বাংলাদেশ
২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ৫ শতাংশের কিছু বেশি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে এসেছে। ওই বছর দেশের মোট স্থাপিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা ছিল প্রায় ১ দশমিক ৪৯ গিগাওয়াট।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
এই লক্ষ্য অর্জনে চলতি দশকের শেষ পর্যন্ত প্রতিবছর প্রায় ৭৬০ মেগাওয়াট নতুন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা যোগ করতে হবে। অথচ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্মাণাধীন প্রকল্পের মোট সক্ষমতা ছিল মাত্র ৩৫৮ মেগাওয়াট।
জেডসিএর মূল্যায়ন হচ্ছে, বাংলাদেশ যদি আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ায়, তাহলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের ধাক্কা তুলনামূলকভাবে কমানো সম্ভব হবে।



