বিশ্বজুড়ে ধর্মকে কেন্দ্র করে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত বিদ্বেষ, হয়রানি এবং সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মীয় শত্রুতা ২০২৩ সালে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন দেশে ধর্মের ওপর সরকারি বিধিনিষেধের মাত্রা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের ১৬তম বার্ষিক বৈশ্বিক ধর্মীয় বিধিনিষেধ ও শত্রুতা-বিষয়ক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। ‘পিউ-টেম্পলটন গ্লোবাল রিলিজিয়াস ফিউচারস’ প্রকল্পের আওতায় বিশ্বের ১৯৮টি দেশ ও অঞ্চলের ২০২৩ সালের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধর্মীয় সামাজিক শত্রুতার দিক থেকে বাংলাদেশের পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশ ‘উচ্চ’ মাত্রার সামাজিক শত্রুতার দেশের তালিকায় থাকলেও ২০২৩ সালে উঠে এসেছে ‘অত্যন্ত উচ্চ’ শ্রেণিতে।
১০-এর স্কেলে বাংলাদেশের সামাজিক শত্রুতা সূচকের স্কোর ২০২২ সালের ৬.১ থেকে ১.৭ পয়েন্ট বেড়ে ২০২৩ সালে ৭.৮ হয়েছে। পিউর বিশ্লেষণে বাংলাদেশে সংঘটিত একাধিক গণসহিংসতার ঘটনা এই অবনতির পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
পঞ্চগড়ে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ওপর হামলা
বাংলাদেশের স্কোর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ২০২৩ সালের দুটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে পিউ রিসার্চ সেন্টার।
এর একটি ঘটে ওই বছরের ৩ ও ৪ মার্চ পঞ্চগড়ের আহমদনগরে। আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের বার্ষিক সালানা জলসাকে কেন্দ্র করে সেখানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
পিউর প্রতিবেদনে ব্যবহৃত তথ্য অনুযায়ী, ওই সহিংসতায় দুজন নিহত এবং অনেকে আহত হন। আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বহু বাড়িঘর আক্রান্ত হয়। তাদের একটি উপাসনালয় এবং বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া একটি ক্লিনিকেও ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়।
আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় পরিচয় ও তাদের বার্ষিক সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হওয়ায় ঘটনাটি পিউর সামাজিক শত্রুতা সূচকের মূল্যায়নে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
কোটালীপাড়ায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হামলা
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উল্লেখ করা আরেকটি ঘটনা গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ তুলে এক হিন্দু ব্যক্তির বাড়ির সামনে শত শত মানুষ জড়ো হন। পরে সেখানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
পিউর মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ধর্মীয় পরিচয় বা ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের সংঘবদ্ধ সহিংসতা সামাজিক শত্রুতা হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই ধরনের ঘটনাগুলোর কারণেই বাংলাদেশের সামাজিক শত্রুতা সূচকের স্কোর এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
‘অত্যন্ত উচ্চ’ ঝুঁকির ছয় দেশের একটি বাংলাদেশ
২০২৩ সালে বিশ্বের মাত্র ছয়টি দেশ ধর্মীয় সামাজিক শত্রুতার ‘অত্যন্ত উচ্চ’ শ্রেণিতে ছিল। দেশগুলো হলো নাইজেরিয়া, ভারত, ইসরায়েল, সিরিয়া, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান।
এই শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর সামাজিক শত্রুতা সূচকের স্কোর অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে ছিল। বাংলাদেশ ৭.৮ স্কোর নিয়ে এই তালিকায় স্থান পেয়েছে।
২০২২ সালে বাংলাদেশ ও ইসরায়েল উভয়ই ‘উচ্চ’ শ্রেণিতে ছিল। পরের বছর পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় দুটি দেশই ‘অত্যন্ত উচ্চ’ শ্রেণিতে উঠে আসে।
৫৫ দেশে ধর্মীয় শত্রুতা উচ্চ বা অত্যন্ত উচ্চ
পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে ১৯৮টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ৫৫টিতে ধর্মকে কেন্দ্র করে সামাজিক শত্রুতার মাত্রা ছিল ‘উচ্চ’ অথবা ‘অত্যন্ত উচ্চ’। ২০২২ সালে এমন দেশের সংখ্যা ছিল ৪৫।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এই দুই শ্রেণিতে আরও ১০টি দেশ যুক্ত হয়েছে।
বিশ্বের ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিস্থিতি মূল্যায়নে পিউ দুটি পৃথক সূচক ব্যবহার করে। একটি হলো সামাজিক শত্রুতা সূচক, যার মাধ্যমে ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও সংগঠনের ধর্মকেন্দ্রিক বৈরিতা ও সহিংসতা পরিমাপ করা হয়। অন্যটি সরকারি বিধিনিষেধ সূচক, যার মাধ্যমে আইন, সরকারি নীতি ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধের মাত্রা মূল্যায়ন করা হয়।
৮৮ দেশে পরিস্থিতির অবনতি
২০২৩ সালে ১৩৯টি দেশে সামাজিক শত্রুতা সূচকের স্কোরে পরিবর্তন হয়েছে।
এর মধ্যে ৮৮টি দেশে ধর্মীয় সামাজিক শত্রুতা বেড়েছে এবং ৫১টি দেশে কমেছে। বাকি ৫৯টি দেশ ও অঞ্চলের স্কোর অপরিবর্তিত ছিল।
পিউর ১৬ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে এক বছরে মাত্র ৫১টি দেশে সামাজিক শত্রুতা কমার ঘটনা সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে আগের বছরের তুলনায় বেশি দেশে পরিস্থিতির অবনতি ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সংঘাত বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা নির্দেশ করছে।
ইসরায়েলের স্কোরেও বড় উল্লম্ফন
বাংলাদেশের পাশাপাশি ২০২৩ সালে সামাজিক শত্রুতা সূচকে বড় পরিবর্তন হয়েছে ইসরায়েলের।
২০২২ সালে দেশটির স্কোর ছিল ৭.১। ২০২৩ সালে তা বেড়ে ৮.৪ হয়।
পিউর মূল্যায়নে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা থেকে হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে চালানো হামলাও দেশটির সামাজিক শত্রুতা সূচকের স্কোর বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
পিউর গবেষণা পদ্ধতি অনুযায়ী, ধর্মীয় পরিচয়সম্পন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর কোনো হামলা যে দেশের ভূখণ্ডে ঘটে, সংশ্লিষ্ট দেশের সামাজিক শত্রুতা সূচকে সেই ঘটনা বিবেচনা করা হয়। ফলে কোনো দেশের স্কোর বেশি হওয়ার অর্থ এই নয় যে কেবল ওই দেশের সাধারণ জনগণই সব সহিংসতার জন্য দায়ী।
আফগানিস্তান, মিশর ও ইরাকে কিছুটা উন্নতি
সামগ্রিক বৈশ্বিক পরিস্থিতির অবনতি হলেও কয়েকটি দেশে ধর্মীয় সামাজিক শত্রুতা কমেছে।
আফগানিস্তান, মিশর ও ইরাক ২০২৩ সালে ‘অত্যন্ত উচ্চ’ শ্রেণি থেকে নেমে ‘উচ্চ’ শ্রেণিতে এসেছে।
আফগানিস্তানের স্কোর ৭.৩ থেকে কমে ৭.০ এবং মিশরের ৭.৪ থেকে ৭.১ হয়েছে। ইরাকের ক্ষেত্রে এক পয়েন্টের উন্নতি হয়েছে—স্কোর ৭.৮ থেকে কমে ৬.৮ হয়েছে।
তবে সামাজিক শত্রুতা কমে আসার অর্থ এসব দেশে সামগ্রিক ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিস্থিতি একই হারে উন্নত হয়েছে—এমন নয়। কারণ পিউ সামাজিক শত্রুতা ও সরকারি বিধিনিষেধকে দুটি স্বতন্ত্র সূচকে পরিমাপ করে।
সরকারি বিধিনিষেধে বড় পরিবর্তন নেই
সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মীয় শত্রুতা বাড়লেও সরকারের আরোপিত ধর্মীয় বিধিনিষেধের বৈশ্বিক চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি।
২০২৩ সালে ৫৮টি দেশ ও অঞ্চলে ধর্মের ওপর সরকারি বিধিনিষেধের মাত্রা ‘উচ্চ’ অথবা ‘অত্যন্ত উচ্চ’ ছিল। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫৯।
আইন, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ পরিমাপকারী সরকারি বিধিনিষেধ সূচকে ২০২৩ সালে ২৫টি দেশ ‘অত্যন্ত উচ্চ’ পর্যায়ে ছিল।
এই সূচকে অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার বিধিনিষেধ থাকা দেশগুলোর মধ্যে চীন, ইরান, আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সিরিয়া ও উজবেকিস্তান উল্লেখযোগ্য।
কীভাবে তৈরি হয় পিউর সূচক
পিউ রিসার্চ সেন্টার কোনো একটি ঘটনা বা একটি উৎসের ওপর ভিত্তি করে দেশের স্কোর নির্ধারণ করে না। গবেষকেরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও সরকারি উৎস থেকে সংগৃহীত তথ্য নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করেন।
এসব উৎসের মধ্যে রয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর, জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও ফ্রিডম হাউসের প্রকাশিত তথ্য ও প্রতিবেদন।
সামাজিক শত্রুতা সূচকে ধর্মীয় বিদ্বেষজনিত সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ, ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা, ধর্মের নামে সশস্ত্র কর্মকাণ্ড, ধর্মীয় পোশাক ও রীতিনীতি নিয়ে হয়রানিসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়।
অন্যদিকে সরকারি বিধিনিষেধ সূচকে ধর্মীয় বিশ্বাস ও চর্চার ওপর আইনগত বাধা, ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ, ধর্মান্তর বা ধর্ম প্রচারে বিধিনিষেধ এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্মীয় বৈষম্যের মতো বিষয় মূল্যায়ন করা হয়।
পিউর সর্বশেষ পর্যালোচনা দেখাচ্ছে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ধর্মীয় সামাজিক শত্রুতা ও সরকারি বিধিনিষেধ এখনো নিম্ন থেকে মাঝারি পর্যায়ে রয়েছে। তবে উচ্চ ও অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার সামাজিক শত্রুতার দেশের সংখ্যা এক বছরে ৪৫ থেকে ৫৫-তে পৌঁছানো নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এক বছরে ৬.১ থেকে ৭.৮-এ পৌঁছানো এবং ‘উচ্চ’ থেকে ‘অত্যন্ত উচ্চ’ শ্রেণিতে চলে যাওয়া ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ সহিংসতার প্রভাবকেই সামনে এনেছে।



