নারায়ণগঞ্জের বন্দরে ইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশের এক নেতাকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের কথিত নেতাসহ নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শুক্রবার সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন সংগঠনটির নেতাকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। এতে মহাসড়কের দুই দিকে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।
নিহত মুজাহিদুল ইসলাম ওরফে বুলবুল ইসলামী যুব আন্দোলনের বন্দর থানা শাখার আইন ও মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। তিনি বন্দর এলাকার শাহী মসজিদ এলাকার প্রয়াত রাজা মাস্টারের ছেলে।
বৃহস্পতিবার রাতে বন্দরের সালেহনগর এলাকায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে বুলবুলের ওপর হামলা চালানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের কথিত নেতা শেখ সিফাতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে এ ঘটনায় অন্যতম প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পরে অভিযান চালিয়ে আরও আটজনকে আটক করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ইফরান, জুম্মন, মাহফুজ, রিয়াদ ও সিয়ামের নাম জানিয়েছে পুলিশ। এছাড়া সিফাতের সহযোগী হিসেবে পরিচিত তিন নারীকে আটক করা হয়েছে। তাদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
পুরোনো মামলার জেরে হত্যার অভিযোগ পরিবারের
বুলবুলের পরিবারের অভিযোগ, ২০২৪ সালের আগস্টে তার রিকশার গ্যারেজে হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় করা একটি মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় তাকে হত্যা করা হয়েছে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বুলবুল আওয়ামী লীগবিরোধী সহিংস আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তবে ওই সময় আন্দোলনে যুক্ত একদল লোক পরবর্তী সময়ে তার রিকশার গ্যারেজে হামলা চালিয়ে ১৮টি রিকশা লুট করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট বন্দর থানায় কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন বুলবুল। সেই মামলার আসামিদের মধ্যে শেখ সিফাতও ছিলেন।
স্বজনদের অভিযোগ, মামলা করার পর থেকেই সেটি তুলে নিতে বুলবুলের ওপর বারবার চাপ দেওয়া হচ্ছিল। তাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।
পরিবারের দাবি, বৃহস্পতিবার রাতে সালেহনগর এলাকায় বুলবুল একা থাকার সময় একদল লোক তাকে ঘিরে ধরে। মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়াকে কেন্দ্র করে সেখানে বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করেন।
তবে পরিবারের দাবি করা এই হত্যার উদ্দেশ্য পুলিশ এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করেনি।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের কারণ এবং এর সঙ্গে জড়িত সবাইকে শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।
তিনি বলেন, “পুলিশ এ ঘটনায় শেখ সিফাতকে গ্রেপ্তার করেছে। জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে আমরা কাজ করছি। হত্যার কারণ এবং অন্য কারা জড়িত, তা শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।” পরে পুলিশ মোট নয়জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানায়।
হত্যার খবরে বিক্ষোভ, অভিযুক্তদের বাড়িতে হামলা
বুলবুলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বৃহস্পতিবার রাতেই বন্দর এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা রাস্তায় নেমে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন।
স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বিক্ষোভের একপর্যায়ে সিফাত ও তার কয়েকজন স্বজনের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
শুক্রবার সকালেও বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা মদনপুর এলাকায় জড়ো হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন।
বিক্ষোভকারীরা মহাসড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বুলবুল হত্যায় জড়িত সবাইকে দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। অবরোধের কারণে দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই মহাসড়কের উভয় দিকে যান চলাচল বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়।
পরে পুলিশের আশ্বাসে বিক্ষোভকারীরা মহাসড়ক ছেড়ে দেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।

