সৌদি আরবের স্কুল পাঠ্যবইয়ে ফিলিস্তিন, জেরুজালেম, ইসরায়েল ও ইহুদিবাদ নিয়ে ব্যবহৃত ভাষা ও উপস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন সংস্করণের একটি মানচিত্র থেকে ‘ফিলিস্তিন’ নাম সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে একাদশ শ্রেণির আরবি ভাষার পাঠ্যবই থেকে বাদ পড়েছে—‘মুসলিমরা কখনো জেরুজালেম ছাড়বে না’—এমন একটি বাক্য।
ইসরায়েলভিত্তিক শিক্ষা পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা সংস্থা IMPACT-se-এর সৌদি আরবের ২০২৪-২৬ শিক্ষাক্রম পর্যালোচনায় এসব পরিবর্তনের তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটি গত জুলাইয়ে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
জেরুজালেম নিয়ে বাক্য বাদ
পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, সৌদি আরবের একাদশ শ্রেণির আরবি ভাষার বইয়ের আগের সংস্করণে জেরুজালেম নিয়ে ‘মুসলিমরা কখনো জেরুজালেম ছাড়বে না’ অর্থের একটি বাক্য ছিল। নতুন সংস্করণে সেটি আর রাখা হয়নি।
IMPACT-se-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, ওই বাক্যটি জেরুজালেমকে মুসলিম ও অন্য গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চলমান সংঘাতের ক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।
মানচিত্রে নেই ফিলিস্তিন, ইসরায়েলও নয়
পাঠ্যবইয়ে ব্যবহৃত মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রেও পরিবর্তন শনাক্ত করেছে সংস্থাটি। আগের কিছু সংস্করণে ইসরায়েলের নাম উল্লেখ না করে সংশ্লিষ্ট পুরো ভূখণ্ডকে ‘ফিলিস্তিন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো।
কিন্তু ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ের ওই মানচিত্র থেকে ‘ফিলিস্তিন’ নামটি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে সেখানে ‘ইসরায়েল’ নামও যুক্ত করা হয়নি।
ফলে পরিবর্তনটি ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিফলন কি না, তা সরাসরি বলা যাচ্ছে না। বরং মানচিত্রে উভয় নামই অনুপস্থিত রয়েছে।
‘ইহুদিবাদী শত্রু’র বদলে ‘ইসরায়েলি দখলদারত্ব’
একাদশ শ্রেণির ইতিহাসের একটি পাঠ্যবইয়েও ভাষাগত পরিবর্তন এসেছে। সেখানে আগে ব্যবহৃত ‘ইহুদিবাদী শত্রু’ শব্দগুলোর পরিবর্তে এখন ‘ইসরায়েলি দখলদারত্ব’ ব্যবহার করা হয়েছে।
IMPACT-se-এর মতে, এর মাধ্যমে ইসরায়েলবিরোধী ভাষার তীব্রতা কিছুটা কমেছে। তবে ‘ইসরায়েলি দখলদারত্ব’ শব্দবন্ধটি যদি পুরো ইসরায়েল রাষ্ট্রকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তাহলে সেটি এখনো ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দেওয়ার সৌদি অবস্থানের প্রতিফলন হতে পারে।
ধর্মীয় পাঠেও পরিবর্তন
শুধু ফিলিস্তিন বা ইসরায়েল নয়, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং ইসলামবহির্ভূত বিশ্বাসসংক্রান্ত কিছু বিষয়েও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
পর্যালোচনায় বলা হয়, ইসলামী শিক্ষা বিষয়ের একটি পাঠ্যবই থেকে অমুসলিমদের পরকালের শাস্তির ইঙ্গিতসংবলিত একটি কোরআনের আয়াত সরানো হয়েছে। এর পরিবর্তে ইসলামকে সত্য ধর্ম হিসেবে উপস্থাপনকারী অন্য একটি আয়াত যুক্ত করা হয়েছে।
নতুন সংস্করণ থেকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অসুস্থ এক ইহুদি বালককে দেখতে যাওয়ার একটি হাদিসও বাদ দেওয়া হয়েছে। IMPACT-se এই পরিবর্তনকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিষয়ে আরও গ্রহণযোগ্য দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে।
ইহুদিবাদ নিয়ে কিছু পুরোনো বর্ণনা এখনো রয়েছে
পর্যালোচনায় সৌদি পাঠ্যবই থেকে ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে চিহ্নিত বিভিন্ন বিষয় অপসারণের কথাও বলা হয়েছে। তবে কিছু পাঠে ইহুদিবাদীদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের নজির এখনো রয়েছে।
একটি পাঠে ইসরায়েলের প্রথম প্রেসিডেন্ট ও ইহুদিবাদী নেতা খায়েম ওয়াইজম্যান এবং সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজের মধ্যকার সাক্ষাতের বিবরণ রয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, ফিলিস্তিন প্রশ্নে সৌদি অবস্থান পরিবর্তনের বিনিময়ে ওয়াইজম্যান অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন।
IMPACT-se-এর মতে, ওই বিবরণে ইহুদিবাদীদের ষড়যন্ত্রমূলকভাবে উপস্থাপনের উপাদান রয়েছে। তবে সংস্থাটি একই সঙ্গে স্বীকার করেছে, ওয়াইজম্যানের ওই প্রস্তাবসংক্রান্ত মূল ঘটনার ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে।
সহনশীলতা ও সহাবস্থানের ওপর জোর
সৌদি শিক্ষাক্রমের সামগ্রিক পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে IMPACT-se বলছে, দেশটির পাঠ্যবইয়ে শান্তি, সহাবস্থান ও ধর্মীয় সহনশীলতার ওপর আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সংস্থাটির ২০২৬ সালের পর্যালোচনা অনুযায়ী, উগ্রবাদ ও অসহিষ্ণুতামূলক বিষয়বস্তু কমানোর পাশাপাশি ইসরায়েল ও ইহুদিবাদ নিয়ে ব্যবহৃত ভাষাও পর্যায়ক্রমে নরম করা হচ্ছে।
তবে মানচিত্র থেকে ‘ফিলিস্তিন’ নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সৌদি আরব এখনো ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। একই সঙ্গে রিয়াদ প্রকাশ্যে বলে আসছে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে অগ্রগতি ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ হবে না। ফলে পাঠ্যবইয়ের এসব পরিবর্তন সৌদি আরবের বৃহত্তর আঞ্চলিক ও কূটনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, তা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।




