অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে শ্রদ্ধা আর নীরব আবেগে। শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে পুলিশের একটি চৌকস দলের গার্ড অব অনার প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি। এরপর একে একে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান নগর ও বিভাগের শীর্ষ প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও পেশাজীবী নেতারা।
প্রথম পর্যায়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান ও মো. এরশাদ উল্লাহ, বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন এবং জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তাঁদের পর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ ও পুলিশ সুপার নাজির আহমেদ খান ফুল দেন। বীর মুক্তিযোদ্ধারাও পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণ করেন।
মধ্যরাতের কর্মসূচির পর শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও পেশাজীবী সংগঠন পর্যায়ক্রমে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি, আনসার ও ভিডিপি, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, ট্যুরিস্ট পুলিশ, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন, বিভাগীয় সমাজসেবা অধিদপ্তর, যুবদল, ছাত্রদল, শ্রমিক দল, নৌ পুলিশ ও পিবিআইসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

শহীদ মিনারের দিকে দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা যায়। অনেকেই খালি পায়ে প্রভাতফেরিতে অংশ নেন। কারও হাতে জাতীয় পতাকা, কারও হাতে ব্যানার-ফেস্টুন। মাইকে ভেসে আসে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গান। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে অনেক অভিভাবককে শিশুদের সঙ্গে নিয়ে আসতে দেখা গেছে।
চট্টগ্রাম ছাড়াও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় একইভাবে রাতের প্রথম প্রহর থেকে শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, খুলনা মহানগরীর শহীদ হাদিস পার্ক, রাজশাহীর সাহেববাজার শহীদ মিনার, বরিশাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এবং রংপুর নগরীর শহীদ আবু সাঈদ চত্বরেও প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী ও কক্সবাজারসহ চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলোতেও প্রভাতফেরি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নগরজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল এবং শহীদ মিনার এলাকায় প্রবেশে ধাপে ধাপে নিরাপত্তা তল্লাশি চালানো হয়।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের স্মরণে ২১ ফেব্রুয়ারি এখন কেবল বাংলাদেশের জাতীয় শোক ও গৌরবের দিনই নয়, বরং ইউনেসকো স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবেও বিশ্বজুড়ে পালিত হয়। ভাষার মর্যাদা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার বার্তা ছড়িয়ে দিতে এ দিনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নীরব প্রহরে যখন একের পর এক পুষ্পস্তবক জমা হচ্ছিল, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ভাষা আন্দোলনের চেতনা এখনও জীবন্ত। শহীদদের রক্তে অর্জিত ভাষার মর্যাদা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রত্যয়েই শেষ হয় প্রথম প্রহরের কর্মসূচি।