জাকির হুসেন: পাঁচ টাকা থেকে বিশ্বমঞ্চে তবলার কিংবদন্তি

জন্মের পর শিশুর কানে প্রার্থনা শোনানোর রীতি ছিল পরিবারে। কিন্তু বাবা যখন নবজাতক ছেলেকে প্রথম কোলে নিলেন, প্রার্থনার প্রচলিত শব্দের বদলে তার কানে উচ্চারণ করলেন তবলার বোল। মা বিস্মিত, কিছুটা ক্ষুব্ধও। প্রশ্ন করেছিলেন, প্রার্থনা করতে বলেছি, আর তুমি তাকে তবলার তাল শোনাচ্ছ?

বাবার উত্তর ছিল—“এটাই আমার প্রার্থনা।”

সেই শিশুটিই পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠেন উস্তাদ জাকির হুসেন—তবলার এমন এক জাদুকর, যিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সীমানা পেরিয়ে এই বাদ্যযন্ত্রের ভাষা পৌঁছে দিয়েছিলেন পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের কাছে।

৭৩ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর একটি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন বিশ্বখ্যাত এই তবলাশিল্পী। ইডিওপ্যাথিক পালমোনারি ফাইব্রোসিসে ভুগছিলেন তিনি। তার মৃত্যুর খবর পরিবার নিশ্চিত করার পর ভারতসহ বিশ্বের সংগীতাঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া।

তবে জাকির হুসেনের চলে যাওয়ার পর তার জীবনের গল্পগুলো যেন নতুন করে বলছে—কীভাবে বাবার কোলে তবলার বোল শোনা সেই শিশু একদিন নিজেই হয়ে উঠেছিলেন তবলার আরেক নাম।

‘এটাই আমার প্রার্থনা’

১৯৫১ সালের ৯ মার্চ মুম্বাইয়ে জন্ম জাকির হুসেনের। তার বাবা উস্তাদ আল্লা রাখা ছিলেন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের কিংবদন্তি তবলাশিল্পী এবং প্রখ্যাত সেতারবাদক পণ্ডিত রবিশঙ্করের দীর্ঘদিনের সংগীতসঙ্গী।

কয়েক বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে নিজের জন্মের পরের একটি ঘটনা বাবার কাছে শোনা স্মৃতি হিসেবে তুলে ধরেছিলেন জাকির।

তিনি বলেছিলেন, “আমাকে বাড়িতে আনার পর বাবা কোলে নিলেন। আমাদের পরিবারের ঐতিহ্য ছিল শিশুর কানে প্রার্থনা শোনানো। কিন্তু বাবা আমার কানে তবলার বোল বলতে শুরু করলেন। মা খুব রেগে গিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি কী করছ? প্রার্থনা করতে বলছি, আর তুমি তবলার তাল শোনাচ্ছ!’”

আল্লা রাখার জবাবটি ছিল আরও তাৎপর্যপূর্ণ।

“এটাই আমার প্রার্থনা। আমি মা সরস্বতী ও ভগবান গণেশের পূজারি। আমার শিক্ষকরা আমাকে যা দিয়েছেন, তা-ই আমি আমার সন্তানের মধ্যে পৌঁছে দিতে চাই।”

বাবার সেই আকাঙ্ক্ষা যেন অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করেছিলেন জাকির।

তবলাকে কোলে নিয়ে ঘুমাতেন

মুম্বাইয়ের সেন্ট মাইকেলস স্কুলে জাকিরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু। পরে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে স্নাতক হন।

তবে বিশ্বখ্যাত শিল্পীর জীবনের শুরুর দিনগুলো মোটেও বিলাসবহুল ছিল না। অনুষ্ঠান করতে এক শহর থেকে অন্য শহরে ট্রেনে ছুটে বেড়াতে হতো। কখনো বসার বা শোয়ার জায়গাও মিলত না।

জাকির স্মৃতিচারণ করে জানিয়েছিলেন, ট্রেনে জায়গা না পেলে খবরের কাগজ বিছিয়ে মেঝেতেই ঘুমিয়ে পড়তেন।

কিন্তু তবলাটি মেঝেতে রাখতেন না।

বাদ্যযন্ত্রটির প্রতি তার শ্রদ্ধা এতটাই গভীর ছিল যে, কারও পা তবলায় লেগে যেতে পারে—এই আশঙ্কায় সেটি নিজের কোলে নিয়েই ঘুমাতেন।

তিনি বলেছিলেন, “তবলায় কারও পা লেগে যাক, আমি তা মেনে নিতে পারতাম না। তাই তবলাকে কোলে নিয়েই ঘুমাতাম।”

মা চাননি ছেলে তবলাকে পেশা বানাক

বাবা ছিলেন কিংবদন্তি তবলাশিল্পী, অথচ মা চাননি জাকির পেশাদার তবলাবাদক হন।

কারণ সেই সময় সংগীতশিল্পীর জীবন আজকের মতো আর্থিক নিরাপত্তা বা সামাজিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিত না। জাকির নিজেই জানিয়েছিলেন, এমন সময়ও গেছে যখন কোনো অনুষ্ঠানে বাজানোর পর অর্থের বদলে শুধু খাবার দিয়েই শিল্পীকে সম্মান জানানো হতো।

কিন্তু বাবার কাছ থেকে পাওয়া সংগীতের উত্তরাধিকার এবং তবলার প্রতি নিজের গভীর টান শেষ পর্যন্ত তাকে অন্য কোনো পথে যেতে দেয়নি।

প্রথম পারিশ্রমিক পাঁচ টাকা

মাত্র ১২ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে মঞ্চে ওঠেন জাকির। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের একঝাঁক কিংবদন্তি—পণ্ডিত রবিশঙ্কর, উস্তাদ আলি আকবর খান, বিসমিল্লাহ খান, পণ্ডিত শান্ত প্রসাদ ও পণ্ডিত কিষণ মহারাজ।

সেই অনুষ্ঠানে বাজিয়ে ছোট্ট জাকির পেয়েছিলেন পাঁচ টাকা।

জীবনের পরবর্তী সময়ে তিনি অর্থ, খ্যাতি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি—সবই পেয়েছেন। কিন্তু প্রথম উপার্জনের সেই পাঁচ টাকা তার কাছে থেকে গিয়েছিল অমূল্য স্মৃতি হয়ে।

জাকির বলেছিলেন, “জীবনে অনেক অর্থ উপার্জন করেছি, কিন্তু সেই পাঁচ টাকার মূল্য আমার কাছে অসীম।”

১৮ বছর বয়সে আমেরিকা, পকেটে সামান্য অর্থ

কৈশোর পেরোতেই জাকিরের সামনে খুলতে শুরু করে বৃহত্তর পৃথিবী। মাত্র ১৮ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি।

তরুণ জাকিরের চোখে তখন অন্য এক স্বপ্নও ছিল—জিন্স পরবেন, রকস্টারের মতো জীবন কাটাবেন। কিন্তু আমেরিকায় পৌঁছে অপেক্ষা করছিল কঠিন বাস্তবতা।

সপ্তাহে মাত্র ২৫ ডলারে দিন চালাতে হয়েছে তাকে। অর্থ বাঁচাতে একটি সবজির তরকারি রান্না করে সেটিই বারবার গরম করে খেয়েছেন। সংগীতের আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের জায়গা করে নেওয়ার পেছনে ছিল এমন বহু দিনের সংগ্রাম।

কিন্তু সেই কঠিন সময়ই তাকে পশ্চিমা সংগীতজগতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের পাশাপাশি জ্যাজ ও ফিউশন সংগীতের শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন তিনি।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

সঙ্গতের বাদ্যযন্ত্র থেকে স্বতন্ত্র শিল্প

জাকির হুসেনের সবচেয়ে বড় অবদান শুধু অসাধারণ তবলা বাজানো নয়; তবলাকে বিশ্ব কীভাবে দেখে, সেই ধারণাটিও বদলে দিয়েছিলেন তিনি।

একসময় ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে তবলা প্রধানত কণ্ঠশিল্পী বা অন্য বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে তাল দেওয়ার সঙ্গতযন্ত্র হিসেবেই বিবেচিত হতো। জাকির ও তার আগের প্রজন্মের শিল্পীদের সাধনায় সেই অবস্থান বদলে যায়।

তবলা নিজেই হয়ে ওঠে মঞ্চের কেন্দ্রীয় আকর্ষণ। একক বাদনেও যে এই বাদ্যযন্ত্র শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখতে পারে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে তা প্রতিষ্ঠা করেন জাকির।

তবে এই কৃতিত্ব কখনো একা নিজের বলে দাবি করেননি তিনি।

তার ভাষায়, “আমার এই সাফল্যের পেছনে অন্তত দুই প্রজন্মের কঠোর পরিশ্রম রয়েছে। আমি যখন কাজ শুরু করি, তখন তবলা নিয়ে আর অবহেলার জায়গাই ছিল না।”

শাস্ত্রীয় সংগীত থেকে জ্যাজ ও ফিউশন

জাকির হুসেন কখনো নিজেকে শুধু ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের গণ্ডিতে আটকে রাখেননি। তার তবলা কথা বলেছে জ্যাজের সঙ্গে, ফিউশনের সঙ্গে, বিশ্বের বিভিন্ন সংগীতধারার সঙ্গে।

বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে তিনি ভারতীয় তালবাদ্যের সম্ভাবনাকে নতুনভাবে তুলে ধরেন। তার হাত ধরে তবলা এমন সব আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছে যায়, যেখানে আগে ভারতীয় শাস্ত্রীয় বাদ্যযন্ত্রের উপস্থিতি ছিল সীমিত।

তার বাজানোর বিশেষত্ব ছিল শুধু দ্রুততা বা কারিগরি দক্ষতায় নয়। তবলার প্রতিটি বোলকে তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করতেন, যেন বাদ্যযন্ত্রটি শ্রোতার সঙ্গে কথোপকথন করছে।

পদ্মবিভূষণ থেকে গ্র্যামি

দীর্ঘ সংগীতজীবনে ভারত ও বিশ্বের অসংখ্য সম্মান পেয়েছেন জাকির হুসেন।

১৯৮৮ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। ২০০২ সালে পান পদ্মভূষণ। ২০২৩ সালে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মবিভূষণ লাভ করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক সংগীতাঙ্গনেও তার স্বীকৃতি ছিল অসাধারণ। ক্যারিয়ারে একাধিকবার গ্র্যামি পুরস্কার জিতে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত ও তবলাকে বিশ্বমঞ্চে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছিলেন তিনি।

শেষ হলো একটি যুগ, থেকে গেল তবলার ভাষা

জাকির হুসেনের জীবন যেন একটি বৃত্তের মতো—জন্মের পর বাবার মুখে শোনা তবলার বোল দিয়ে যার শুরু, আর কয়েক দশক পর সেই বোলই ছড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবীর নানা প্রান্তে।

ট্রেনের মেঝেতে খবরের কাগজ বিছিয়ে ঘুমানো তরুণ, যে নিজের তবলাকে মাটিতে না রেখে বুকে আগলে রাখতেন, তিনিই একদিন বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত তালবাদ্যশিল্পীদের একজন হয়ে ওঠেন।

খ্যাতি, পুরস্কার কিংবা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বাইরেও তার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার সম্ভবত এখানেই—একটি বাদ্যযন্ত্রকে তিনি শুধু বাজাননি, তাকে দিয়েছেন স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর।

বাবা আল্লা রাখা একদিন নবজাতক ছেলের কানে তবলার বোল শুনিয়ে বলেছিলেন, “এটাই আমার প্রার্থনা।”

জাকির হুসেনের দীর্ঘ সংগীতজীবন যেন সেই প্রার্থনারই উত্তর।

spot_img
spot_img

অধিক পঠিত

Related Articles