চট্টগ্রাম: ‘বাঁশখালী মইশখালী পাল উড়াইয়া দিলে, সাম্পান গুড়গুড়াই টানে’—চট্টগ্রামের মানুষের কাছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিচিত এই গানের শিল্পী সনজিত আচার্য আর নেই। সোমবার (৯ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি পরলোকগমন করেন।
পারিবারিক সূত্র জানায়, সোমবার সকালে স্ট্রোক করার পর সনজিত আচার্যকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্ধ্যায় তার মৃত্যু হয়।
তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর চট্টগ্রামের সংগীত ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোক নেমে আসে। দীর্ঘদিনের সহশিল্পী, শিষ্য ও সংস্কৃতিজনেরা ছুটে যান নগরীর পাথরঘাটায় তার বাসায়।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগীতের কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্ব সনজিত আচার্য শুধু কণ্ঠশিল্পী ছিলেন না। একাধারে গীতিকার, সুরকার ও সংগীতশিল্পী হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি নাটক ও চলচ্চিত্রের কাহিনিকার হিসেবেও তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের এক স্বতন্ত্র কণ্ঠ
চট্টগ্রামের নিজস্ব ভাষা, মানুষের জীবনযাপন, প্রেম-বিরহ, হাসি-কান্না এবং নদী-সমুদ্রঘেরা জনপদের গল্প সনজিত আচার্যের গানে বারবার উঠে এসেছে। আঞ্চলিক ভাষার স্বাভাবিকতা ধরে রেখেই তিনি গানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
‘বাঁশখালী মইশখালী পাল উড়াইয়া দিলে, সাম্পান গুড়গুড়াই টানে’ তার সবচেয়ে পরিচিত গানগুলোর একটি। চট্টগ্রামের সাম্পান, সমুদ্র এবং উপকূলীয় জনজীবনের আবহ বহনকারী গানটি সময়ের সঙ্গে আঞ্চলিক সংগীতের সীমানা ছাড়িয়ে ব্যাপক পরিচিতি পায়।
সনজিত আচার্যের কণ্ঠ ও সৃষ্টিতে জনপ্রিয় হওয়া আরও অনেক গান দীর্ঘ সময় ধরে শ্রোতাদের মুখে মুখে ফিরেছে।
সনজিত-শেফালী, সনজিত-কল্যাণী এবং সনজিত-কান্তা নন্দীর দ্বৈতকণ্ঠে গাওয়া ‘বাজান গিয়ে দইনর বিলত/ পাটি বিছাই দিয়্যি বইও ঘরত…’, ‘বাঁশ ডুয়ার আড়ালত থাই/ আঁরারে ডাকর কিয়রল্লাই…’, ‘গুরা গুরা হতা হই/ বাগানর আড়ালত বই/ পিরিতির দেবাইল্যা আঁরারে বানাইলা’—এমন বহু গান চট্টগ্রামের চিরসবুজ আঞ্চলিক গানের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।
শেফালী-শ্যামসুন্দরের পর সনজিত-কল্যাণী
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগীতের ইতিহাসে শেফালী ঘোষ ও শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের জুটি এক কিংবদন্তি অধ্যায়। তাদের পর যে কয়েকটি শিল্পীজুটি শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তার মধ্যে সনজিত আচার্য ও কল্যাণী ঘোষের জুটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
দুজনের কণ্ঠে পরিবেশিত গান চট্টগ্রামের গ্রাম থেকে শহর—সর্বত্র শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সনজিত আচার্য শেফালী ঘোষ ও কান্তা নন্দীর সঙ্গেও বহু জনপ্রিয় দ্বৈত গান পরিবেশন করেছেন।
শুধু নিজের গান গাওয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না তিনি। নতুন শিল্পীদের আঞ্চলিক গান শেখানো এবং তাদের সংগীতজগতে প্রতিষ্ঠিত হতে সহযোগিতা করতেন।
তার ‘সাম্পানওয়ালা’ পৌঁছেছিল চলচ্চিত্রে
সনজিত আচার্যের সৃষ্টিশীলতা সংগীতের বাইরেও বিস্তৃত ছিল। সত্তরের দশকের শেষ দিকে তার আঞ্চলিক নাটক ‘সাম্পানওয়ালা’ অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন প্রয়াত সংগীত পরিচালক ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব সত্য সাহা।
চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর দেশজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা, সংস্কৃতি ও জনজীবন বৃহত্তর দর্শকের সামনে নতুনভাবে উঠে আসে।
নাটক ও চলচ্চিত্রের কাহিনি রচনার পাশাপাশি নিজের গান, সুর ও পরিবেশনার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংস্কৃতির স্বতন্ত্র পরিচয় ধরে রাখতে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন সনজিত আচার্য।
‘শত শত শিল্পী তার হাতে গড়া’
শিল্পী কার্তিক মজুমদার পলাশ বলেন, সনজিত আচার্যের মৃত্যুতে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগীতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
তিনি বলেন, “শত শত শিল্পী আছেন সনজিত আচার্যের হাতে গড়া। তার মৃত্যুতে আঞ্চলিক গানে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা পূরণ হওয়ার নয়। এটি সংগীতাঙ্গনের বড় ক্ষতি।”
শিল্পী সুপ্রিয়া মজুমদারের স্মৃতিতেও সনজিত আচার্য একজন শিক্ষক ও অভিভাবক।
তিনি বলেন, “সনজিত আচার্য দাদা আমাকে আঞ্চলিক গান শিখিয়েছেন। তার সঙ্গে অনেক স্মৃতি। কয়েক দিন আগেও তার সঙ্গে কয়েকটি গান গেয়েছি। সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন। দাদার কারণেই আমার আঞ্চলিক গানে আসা।”
গানে বেঁচে থাকবেন সনজিত আচার্য
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগীত শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এর মধ্যে সংরক্ষিত রয়েছে এই অঞ্চলের ভাষা, উচ্চারণ, লোকজ জীবন, নদী-সমুদ্র, প্রেম, হাস্যরস এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বহু অনুষঙ্গ। সনজিত আচার্য দীর্ঘ সংগীতজীবনে সেই ঐতিহ্যকে ধারণ করেছিলেন।
নিজে গান লিখেছেন, সুর করেছেন, কণ্ঠ দিয়েছেন; পাশাপাশি তৈরি করেছেন নতুন শিল্পী। নাটক ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমেও চট্টগ্রামের ভাষা ও সংস্কৃতিকে বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরেছেন।
তার মৃত্যুতে একজন শিল্পীর জীবনাবসান ঘটলেও ‘বাঁশখালী মইশখালী পাল উড়াইয়া দিলে, সাম্পান গুড়গুড়াই টানে’সহ অসংখ্য গানের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগীতের ইতিহাসে সনজিত আচার্যের নাম থেকে যাবে।



